মহাসড়কে পণ্যবাহী পরিবহনের নিরাপত্তা ও চালকদের বিশ্রামের জন্য কোটি কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত অবকাঠামো এখন পরিণত হয়েছে অপরাধীদের অভয়ারণ্যে। সিরাজগঞ্জের পাঁচলিয়ায় নির্মিত আধুনিক সুযোগ-সুবিধা সম্বলিত ট্রাক টার্মিনাল ও বিশ্রামাগারটি নির্মাণের পাঁচ বছর পেরিয়ে গেলেও তা এখনো অপারেশনাল বা ‘Operational’ করা সম্ভব হয়নি। দিনের আলোতে এটি ব্যবহৃত হচ্ছে গোচারণভূমি ও ধান শুকানোর খলা হিসেবে, আর রাতের আঁধারে সেখানে বসছে মাদকসেবীদের জমজমাট আড্ডা।
সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের উদাসীনতায় একদিকে যেমন নষ্ট হচ্ছে ৫৫ কোটি টাকার রাষ্ট্রীয় সম্পদ, তেমনি দূরপাল্লার বা ‘Long-haul’ যাত্রার চালকরা বঞ্চিত হচ্ছেন তাদের প্রাপ্য সেবা থেকে। রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে বা ‘Lack of Maintenance’-এর সুযোগে চুরি হয়ে যাচ্ছে ভবনের জানলা-দরজাসহ মূল্যবান ফিটিংস।
ভুতুড়ে স্থাপনা: রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে চুরির মহোৎসব
সিরাজগঞ্জের পাঁচলিয়ায় মহাসড়কের পাশে প্রায় ১৩ একর বিশাল জায়গাজুড়ে গড়ে তোলা হয়েছিল এই বিশ্রামাগারটি। সরেজমিনে দেখা যায়, যে স্থানে ক্লান্ত চালকদের বিশ্রাম নেয়ার কথা, সেখানে এখন স্থানীয়রা গবাদি পশু চড়াচ্ছেন। টার্মিনালের বিশাল চত্বর ব্যবহার করা হচ্ছে ধান শুকানোর কাজে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, সূর্য ডোবার পরপরই এই এলাকাটি চলে যায় মাদকসেবীদের দখলে। নিরাপত্ত প্রহরী বা কোনো ধরনের ‘Security Surveillance’ না থাকায় রাতের অন্ধকারে চোরচক্র ভবনের গ্রিল, বৈদ্যুতিক তার এবং স্যানিটারি ফিটিংস খুলে নিয়ে যাচ্ছে। অযত্ন আর অবহেলায় ভবনটি এখন কার্যত এক ভুতুড়ে বাড়িতে রূপ নিয়েছে।
কাগজে-কলমে ‘আধুনিক সুযোগ-সুবিধা’, বাস্তবে তালাবদ্ধ
টেকসই ও নিরাপদ মহাসড়ক নিশ্চিত করতে সড়ক বিভাগ বা ‘Roads and Highways Department’ চারটি জাতীয় মহাসড়কে চালকদের জন্য বিশ্রামাগার তৈরির উদ্যোগ নিয়েছিল। এরই অংশ হিসেবে ২০২০ সালে সিরাজগঞ্জে এই প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করা হয়। পরিকল্পনায় ছিল:
একসঙ্গে ১০০টি ট্রাকের জন্য সুরক্ষিত ‘Parking Zone’।
চালকদের জন্য আরামদায়ক শয়নকক্ষ ও ক্যান্টিন।
আধুনিক গোসলখানা ও নামাজের স্থান।
প্রাথমিক চিকিৎসা বা ‘First Aid’ সেন্টার।
যানবাহন মেরামতের জন্য ওয়ার্কশপ ও ওয়াশজোন।
অথচ নির্মাণের পাঁচ বছর পার হলেও এই ‘Modern Amenities’ বা আধুনিক সুযোগ-সুবিধাগুলোর একটিও আলোর মুখ দেখেনি। পুরো স্থাপনাটিই এখন তালাবদ্ধ অবস্থায় পড়ে আছে।
জীবনের ঝুঁকি নিয়ে মহাসড়কে রাত্রিযাপন: চালকদের ক্ষোভ
টার্মিনালটি চালু না হওয়ায় চরম বিপাকে পড়েছেন উত্তরবঙ্গ ও ঢাকাগামী পণ্যবাহী ট্রাকের চালকরা। হিলি থেকে ঢাকাগামী ট্রাকচালক ওসমান ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “সরকার আমাদের জন্য এত টাকা খরচ করে বিল্ডিং বানাল, কিন্তু আমরা তার ছায়াও পেলাম না। বাধ্য হয়ে রাস্তার ওপর বা হোটেলের সামনে গাড়ি পার্ক করতে হয়। এতে একদিকে থাকে পুলিশি ঝামেলা, অন্যদিকে ট্রাকের তেল ও মালামাল চুরির বা ‘Theft Hazard’ আতঙ্ক।”
বগুড়াগামী আরেক চালক নুরুল হকের মতে, “বিশ্রামাগারটি চোখের সামনে নষ্ট হচ্ছে। আমরা চাই দ্রুত এটি খুলে দেওয়া হোক, যাতে আমরা নিরাপদে বিশ্রাম নিতে পারি।”
৫৫ কোটি টাকার গচ্চা: কর্তৃপক্ষের ‘ইজারা’ অজুহাত
প্রকল্প সূত্রে জানা যায়, প্রথমে এই বিশ্রামাগার ও টার্মিনাল নির্মাণের ব্যয় ধরা হয়েছিল ৪২ কোটি ৮০ লাখ টাকা। পরবর্তীতে প্রকল্পের পরিধি বাড়িয়ে বা ‘Cost Escalation’-এর মাধ্যমে আরও ১৩ কোটি টাকা যুক্ত করা হয়। সব মিলিয়ে প্রায় ৫৫ কোটি টাকারও বেশি ব্যয়ে নির্মিত এই স্থাপনা এখন রাষ্ট্রের বোঝা বা ‘White Elephant’ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
এ বিষয়ে সিরাজগঞ্জ সড়ক ও জনপথ বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী ইমরান ফারহান সুমেল জানান, আমলাতান্ত্রিক জটিলতা ও ইজারা প্রক্রিয়ার বা ‘Leasing Process’-এর কারণে এটি চালু করতে দেরি হচ্ছে। তিনি বলেন, “ইজারা পদ্ধতির মাধ্যমে টার্মিনালটি দ্রুত চালুর জন্য আমরা ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ করছি। আশা করছি চালকদের ভোগান্তি লাঘবে শীঘ্রই এটি অপারেশনাল করা যাবে।”