দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষা এবং দীর্ঘমেয়াদী উন্নয়নের রূপরেখা প্রণয়নে জ্ঞানভিত্তিক নেতৃত্বের কোনো বিকল্প নেই। জাতীয় নিরাপত্তা ও কৌশলগত জটিল সিদ্ধান্ত গ্রহণে ন্যাশনাল ডিফেন্স কলেজ (এনডিসি)-এর মাধ্যমে অর্জিত জ্ঞান এক কার্যকরী ভূমিকা রাখবে বলে মন্তব্য করেছেন অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস।
বুধবার (৩ ডিসেম্বর) মিরপুর সেনানিবাসে ন্যাশনাল ডিফেন্স কলেজ আয়োজিত ‘ন্যাশনাল ডিফেন্স কোর্স (এনডিসি) ২০২৫’ এবং ‘আর্মড ফোর্সেস ওয়ার কোর্স (এএফডব্লিউসি) ২০২৫’-এর জাঁকজমকপূর্ণ সমাপনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এ কথা বলেন। এ সময় তিনি বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের ‘জিওপলিটিক্যাল’ বা ভূ-রাজনৈতিক গুরুত্ব এবং সশস্ত্র বাহিনীর পেশাদারিত্বের ওপর বিশেষ আলোকপাত করেন।
কৌশলগত অবস্থান ও গ্লোবাল অপরচুনিটি
প্রধান উপদেষ্টা তার বক্তব্যে বাংলাদেশের ভৌগোলিক অবস্থানকে একটি বিশাল ‘স্ট্র্যাটেজিক অ্যাসেট’ বা কৌশলগত সম্পদ হিসেবে অভিহিত করেন। তিনি বলেন, “বাংলাদেশের কৌশলগত অবস্থান আমাদের জন্য বিশাল সুযোগের দ্বার উন্মোচন করেছে। এই সুযোগ কাজে লাগিয়ে জাতীয় স্বার্থ রক্ষায় আমাদের চৌকস ও দূরদর্শী হতে হবে।”
তিনি আরও উল্লেখ করেন, দেশের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি বিভিন্ন প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও জাতীয় ক্রান্তিলগ্নে বাংলাদেশ সশস্ত্র বাহিনী যে ভূমিকা পালন করেছে, তা নিঃসন্দেহে প্রশংসার দাবিদার। বিশেষ করে ‘ডিজাস্টার ম্যানেজমেন্ট’ এবং অভ্যন্তরীণ স্থিতিশীলতা বজায় রাখার ক্ষেত্রে বাহিনীর সদস্যদের ত্যাগের কথা তিনি গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করেন।
এনডিসি: একটি ‘সেন্টার অফ এক্সিলেন্স’
ড. ইউনূস কোর্স সম্পন্নকারী কর্মকর্তাদের উদ্দেশে বলেন, “আপনারা দীর্ঘ এক বছর কঠোর অধ্যবসায়ের মাধ্যমে যে জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা অর্জন করেছেন, তা কেবল ব্যক্তিগত অর্জন নয়, বরং এটি জাতীয় সম্পদ।” তিনি ন্যাশনাল ডিফেন্স কলেজকে নিরাপত্তা ও উন্নয়ন অধ্যয়নের ক্ষেত্রে একটি ‘সেন্টার অফ এক্সিলেন্স’ বা উৎকর্ষের কেন্দ্র হিসেবে অভিহিত করেন।
তার মতে, বর্তমান বিশ্বের ‘র্যাপিডলি চেঞ্জিং গ্লোবাল কনটেক্সট’ বা দ্রুত পরিবর্তনশীল বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় দক্ষ নেতৃত্ব তৈরি করতে এনডিসি তার ধারাবাহিকতা বজায় রেখেছে। এখান থেকে অর্জিত ‘পলিসি মেকিং’ বা নীতি প্রণয়ন ও কৌশলগত সিদ্ধান্ত গ্রহণের দক্ষতা আগামীতে দেশকে এগিয়ে নিতে সহায়তা করবে।
ফেব্রুয়ারিতে নির্বাচন ও গণভোটের বার্তা
অনুষ্ঠানে প্রাতিষ্ঠানিক আলোচনার পাশাপাশি দেশের চলমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়েও গুরুত্বপূর্ণ বার্তা দেন প্রধান উপদেষ্টা। তিনি স্পষ্টভাবে জানান, আগামী ফেব্রুয়ারিতে অনুষ্ঠিতব্য নির্বাচন ও গণভোট হবে সম্পূর্ণ অবাধ, শান্তিপূর্ণ এবং উৎসবমুখর। গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় উত্তরণের এই ধাপে তিনি সবার সহযোগিতা কামনা করেন।
এছাড়াও, তিনি সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার শারীরিক সুস্থতা কামনা করে উপস্থিত সবার কাছে দোয়া চান, যা অনুষ্ঠানে এক ভিন্ন মাত্রার মানবিক আবেদন তৈরি করে।
অংশগ্রহণ ও আন্তর্জাতিক মেলবন্ধন
এ বছর ন্যাশনাল ডিফেন্স কোর্স ২০২৫-এ মোট ৯৬ জন সদস্য অংশ নেন। এর মধ্যে বাংলাদেশ সশস্ত্র বাহিনীর ৪৯ জন চৌকস কর্মকর্তা, সিভিল অ্যাডমিনিস্ট্রেশন বা অসামরিক প্রশাসনের ১৮ জন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা এবং ১৮টি ভ্রাতৃপ্রতিম দেশের ২৯ জন বিদেশি সদস্য রয়েছেন। এই আন্তর্জাতিক অংশগ্রহণ এনডিসি-র গ্রহণযোগ্যতা ও ‘ডিপ্লোম্যাটিক টাই’ বা কূটনৈতিক সম্পর্ক জোরদারের ইঙ্গিত বহন করে।
পাশাপাশি, বাংলাদেশ সেনা, নৌ ও বিমানবাহিনীর ৫৬ জন কর্মকর্তা সফলভাবে আর্মড ফোর্সেস ওয়ার কোর্স (এএফডব্লিউসি) ২০২৫ সম্পন্ন করেন। প্রধান উপদেষ্টা সকল গ্র্যাজুয়েটদের প্রতি আহ্বান জানান, তারা যেন তাদের অর্জিত প্রজ্ঞা ও ‘প্রফেশনাল এক্সপার্টিজ’ বাংলাদেশের যুগোপযোগী উন্নয়ন ও জাতীয় স্বার্থ রক্ষায় সর্বোত্তমভাবে প্রয়োগ করেন।