রায়পুরের গ্যালারি আজ সাক্ষী থাকল এক ইতিহাসের। দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে সিরিজের প্রথম ওয়ানডেতে সেঞ্চুরি হাঁকিয়ে জানান দিয়েছিলেন, তিনি ফুরিয়ে যাননি। আর বুধবার (৩ ডিসেম্বর) দ্বিতীয় ওয়ানডেতে ব্যাট হাতে যা করলেন, তা এক কথায় ‘মাস্টারক্লাস’। টানা দ্বিতীয় সেঞ্চুরি তুলে নিয়ে আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের ৮৪তম শতকের মাইলফলক স্পর্শ করলেন আধুনিক ক্রিকেটের ‘রান মেশিন’ বিরাট কোহলি। কোহলির এই রাজকীয় প্রত্যাবর্তনের দিনে কম যাননি তরুণ তুর্কি রুতুরাজ গায়কোয়াড়ও। দুই প্রজন্মের দুই তারকার জোড়া সেঞ্চুরি এবং লোকেশ রাহুলের ঝোড়ো ফিনিশিংয়ে ভর করে দক্ষিণ আফ্রিকার সামনে ৩৫৯ রানের বিশাল টার্গেট ছুড়ে দিয়েছে ভারত।
সিরিজের প্রথম ম্যাচে ১৭ রানে জয় পাওয়া ভারত এখন সিরিজ জয়ের ‘মিশন’ সম্পন্ন করতে বল হাতে মাঠে নামবে। তবে রায়পুরের ২২ গজে আজ যা ঘটল, তা নিঃসন্দেহে প্রোটিয়া বোলারদের মনোবল ভেঙে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট।
কোহলি-রুতুরাজ রসায়ন: বিপর্যয় থেকে ‘ডমিনেশন’
টস হেরে ব্যাট করতে নেমে ভারতের শুরুটা কিন্তু খুব একটা মসৃণ ছিল না। দলীয় স্কোরবোর্ডে মাত্র ৬২ রান যোগ করতেই সাজঘরে ফেরেন দুই ওপেনার। অধিনায়ক রোহিত শর্মা (১৪) এবং তরুণ সেনসেশন যশস্বী জয়সওয়াল (২২) দ্রুত বিদায় নিলে কিছুটা চাপে পড়ে স্বাগতিকরা। কিন্তু এরপরই শুরু হয় আসল নাটক। তৃতীয় উইকেটে অভিজ্ঞ বিরাট কোহলি এবং প্রতিভাবান রুতুরাজ গায়কোয়াড় মিলে গড়ে তোলেন এক ইস্পাতকঠিন প্রতিরোধ।
শুধু প্রতিরোধই নয়, ১৯৫ রানের এক বিশাল ‘পার্টনারশিপ’ গড়ে ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ পুরোপুরি নিজেদের দখলে নিয়ে নেন তারা। প্রোটিয়া বোলারদের লাইন-লেন্থ এলোমেলো করে দিয়ে চার-ছক্কার ফুলঝুড়ি ছোটান এই জুটি। ৮৩ বলে ১২টি চার ও ২টি ছক্কায় ১০৫ রানের এক ‘এগ্রেসিভ’ ইনিংস খেলে রুতুরাজ যখন বিদায় নেন, ভারত তখন বড় স্কোরের ভিত পেয়ে গেছে।
অন্যদিকে, কোহলি ছিলেন তার চেনা ছন্দে। ৯৩ বলে ৭টি চার ও ২টি ছক্কায় ১০২ রান করে থামেন তিনি। এটি তার ওয়ানডে ক্যারিয়ারের ৫৩তম এবং সব ফরম্যাট মিলিয়ে ৮৪তম সেঞ্চুরি। টেস্ট ও টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটকে বিদায় জানানোয়, ‘সেঞ্চুরির সেঞ্চুরি’ বা ১০০টি আন্তর্জাতিক শতকের রেকর্ড গড়তে হলে কোহলিকে এখন কেবল ওয়ানডে ফরম্যাটের ওপরই নির্ভর করতে হবে। গত ম্যাচেও তিনি উপহার দিয়েছিলেন ১৩৫ রানের অনবদ্য এক ইনিংস।
রাহুল-জাদেজার ‘ফিনিশিং টাচ’
কোহলি ও রুতুরাজের বিদায়ের পর দক্ষিণ আফ্রিকা হয়তো ভেবেছিল রানের গতি কিছুটা কমবে। কিন্তু ক্রিজে এসে ‘পাওয়ার হিটিং’-এর প্রদর্শনী শুরু করেন লোকেশ রাহুল। শেষদিকে ঝড়ের গতিতে ব্যাট করে মাত্র ৪৩ বলে ৬টি চার ও ২টি ছক্কায় ৬৬ রানে অপরাজিত থাকেন তিনি। তাকে যোগ্য সঙ্গ দেন অলরাউন্ডার রবীন্দ্র জাদেজা, যিনি ২৭ বলে ২৪ রান করে অপরাজিত থাকেন। নির্ধারিত ৫০ ওভারে ৫ উইকেট হারিয়ে ভারতের সংগ্রহ দাঁড়ায় ৩৫৮ রান।
প্রোটিয়াদের কঠিন পরীক্ষা
বল হাতে দক্ষিণ আফ্রিকার মার্কো ইয়ানসেন ৬৩ রান খরচায় ২ উইকেট নিলেও বাকিরা ছিলেন বেশ খরুচে। লুঙ্গি এনগিদি ও নন্দ্রে বার্গার ১টি করে উইকেট পেলেও ভারতের রানের চাকা থামাতে ব্যর্থ হন। সিরিজ বাঁচাতে হলে দক্ষিণ আফ্রিকাকে এখন ওভারপ্রতি ৭.১৮ রান রেটে ব্যাট করতে হবে, যা এই উইকেটে এবং ভারতের বোলিং আক্রমণের বিপক্ষে বেশ বড়সড় এক চ্যালেঞ্জ।
রায়পুরের দর্শকরা আজ কেবল একটি ম্যাচ দেখেনি, দেখেছে অভিজ্ঞতার সঙ্গে তারুণ্যের এক অপূর্ব মেলবন্ধন, যা ভারতকে এনে দিয়েছে সিরিজ জয়ের সুবর্ণ সুযোগ।