চলতি বছরের শুরুতে যখন আল হিলালের সঙ্গে চুক্তির ইতি টেনে নিজের শৈশবের ক্লাব সান্তোসে (Santos) ফিরেছিলেন নেইমার জুনিয়র, তখন ভক্তদের প্রত্যাশা ছিল আকাশচুম্বী। সৌদি আরবের ধুলোবালি আর ইনজুরির অভিশাপ কাটিয়ে ঘরের ছেলে ঘরে ফিরছে—ব্রাজিলিয়ান সমর্থকদের কাছে এর চেয়ে বড় স্বস্তির খবর আর কী হতে পারে! কিন্তু বাস্তবতা ছিল নির্মম। সান্তোসে তার এই ‘সেকেন্ড ইনিংস’ রূপকথার মতো শুরু হয়নি। বরং চোট, বিতর্ক আর পারফর্ম্যান্সের ঘাটতি মিলিয়ে এক ভয়ঙ্কর সময়ের মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে এই সেলেসাও তারকাকে। তবে সব বাধা টপকে মৌসুম শেষে নেইমার জানালেন, তিনি প্রস্তুত তার জীবনের ‘Last Mission’ বা শেষ অভিযানের জন্য।
ইনজুরি, বিতর্ক এবং একটি দুঃস্বপ্নের মৌসুম
২০২৫ সালের গোড়ার দিকে সান্তোসে যোগ দেওয়ার পর থেকেই একের পর এক ইনজুরি পিছু ছাড়েনি নেইমারের। পরিসংখ্যান বলছে, লিগের ৩৮টি ম্যাচের মধ্যে ১৮টিতেই মাঠের বাইরে থাকতে হয়েছে তাকে। শুধু ইনজুরি নয়, শৃঙ্খলজনিত বা Disciplinary Issues নিয়েও কম জলঘোলা হয়নি। চারবার গুরুতর চোটের কবলে পড়া নেইমার যখনই মাঠে ফিরেছেন, প্রত্যাশার ভারে নুয়ে পড়েছেন বারবার।
বিশেষ করে গত ৯ নভেম্বর ফ্লামেঙ্গোর (Flamengo) বিপক্ষে ম্যাচে তার পারফরম্যান্স ছিল হতাশাজনক। দুই মাস পর একাদশে ফিরে পুরো ম্যাচে মাত্র দুটি ‘অন-টার্গেট’ শট নিতে পারেন তিনি। ম্যাচের শেষ মুহূর্তে তাকে সাবস্টিটিউট বা বদলি করা হলে গ্যালারি থেকে ভেসে আসে তীব্র দুয়োধ্বনি। ৩৩ বছর বয়সী এই তারকার জন্য বিষয়টি ছিল চূড়ান্ত অপমানের, যা তাকে মানসিকভাবে একেবারে ভেঙে দেয়।
মানসিক স্বাস্থ্যের বিপর্যয় ও ঘুরে দাঁড়ানোর গল্প
জীবনের এই কঠিন অধ্যায় নিয়ে কোনো রাখঢাক করেননি নেইমার। খোলামেলাভাবেই জানিয়েছেন তার ‘Mental Health’ বা মানসিক স্বাস্থ্যের বিপর্যয়ের কথা। ক্রুজেইরোর বিপক্ষে মৌসুমের শেষ ম্যাচের পর এক সাক্ষাৎকারে নেইমার বলেন, ‘‘আমি স্বীকার করছি, গত কয়েক সপ্তাহ ছিল আমার জীবনের অন্যতম কঠিন সময়। ফ্লামেঙ্গোর ম্যাচের পর যে পরিমাণ সমালোচনার (Criticism) শিকার হয়েছি, তা মনে হয়েছে একটু বেশিই বাড়াবাড়ি। জীবনে প্রথমবার আমাকে সাহায্যের জন্য হাত বাড়াতে হয়েছে। মানসিকভাবে আমি এতটাই ভেঙে পড়েছিলাম যে নিজের শক্তিতে আর উঠে দাঁড়াতে পারছিলাম না।’’
নেইমার আরও জানান, সেই সময় তার কোচ, সতীর্থ এবং পরিবারের অকুণ্ঠ সমর্থন বা ‘Support System’ তাকে এই অন্ধকার জগত থেকে আলোর পথে ফিরিয়ে এনেছে।
মাঠের লড়াই: রেলিগেশন বাঁচানো এবং সমালোচকদের জবাব
সমালোচনার জবাব মুখে নয়, মাঠেই দিয়েছেন নেইমার। পুরোপুরি ফিট না হওয়া সত্ত্বেও সান্তোসের অস্তিত্ব রক্ষার লড়াইয়ে তিনি ছিলেন অকুতোভয়। দলের যখন ‘Relegation’ বা অবনমন চোখ রাঙাচ্ছিল, তখন শেষ তিনটি গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচে মাঠে নামেন তিনি। আর সেখানেই দেখা মেলে পুরনো জাদুকরের। তিন ম্যাচে চারটি গোল এবং একটি অ্যাসিস্ট করে তিনি শুধু দলকে অবনমন থেকেই বাঁচাননি, বরং পয়েন্ট টেবিলের সমীকরণ বদলে দিয়ে সান্তোসকে আগামী মৌসুমের কোপা সুদামেরিকানার (Copa Sudamericana) টিকিটও এনে দিয়েছেন। নিজের জাত বা ‘Class’ যে এখনো ফুরিয়ে যায়নি, তা তিনি প্রমাণ করেছেন বল পায়ে।
অফসিজন পরিকল্পনা ও ‘শেষ মিশন’
ক্লাব মৌসুমের নাটকীয় সমাপ্তির পর নেইমারের ভাবনায় এখন শুধুই ভবিষ্যৎ। জিইটিভি-কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি তার ‘Off-season Plan’ বা ছুটির পরিকল্পনা এবং শারীরিক অবস্থা নিয়ে কথা বলেছেন। তিনি বলেন, ‘‘বছরটা শেষ করছি, এখন একটু মাথা পরিষ্কার করা দরকার। আগামী দশ দিন ফুটবল থেকে পুরোপুরি দূরে থাকব। মানসিকভাবে রিল্যাক্স হওয়াটা এখন খুব জরুরি, কারণ বছরটা এবং শেষ মাসটা ছিল প্রচণ্ড কঠিন।’’
নেইমার নিশ্চিত করেছেন, ছুটির পরপরই তিনি তার বাঁ হাঁটুতে প্রয়োজনীয় সার্জারি (Surgery) করাবেন। ইএসপিএন-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, এটি হতে যাচ্ছে মেনিসকাস সার্জারি। তার লক্ষ্য খুব স্পষ্ট—যেকোনো মূল্যে ফিটনেস বা শারীরিক সক্ষমতা ফিরে পাওয়া।
কার্লো আনচেলত্তি এবং ২০২৬ বিশ্বকাপ
সবশেষে নেইমার উচ্চারণ করেছেন সেই শব্দটি, যার জন্য চাতক পাখির মতো তাকিয়ে আছে পুরো ব্রাজিল—‘বিশ্বকাপ’। অস্ত্রোপচার এবং রিহ্যাব শেষ করে তিনি নিজের সেরা ফর্মে ফিরতে চান। তার মূল লক্ষ্য ২০২৬ সালের বিশ্বকাপে ব্রাজিল দলে জায়গা নিশ্চিত করা এবং কোচ কার্লো আনচেলত্তির (Carlo Ancelotti) পরিকল্পনায় নিজেকে অপরিহার্য প্রমাণ করা। নেইমারের ভাষায়, ‘‘অপারেশনের পর আমি শতভাগ মনোযোগ দেব আমার ফিটনেসে। কারণ, এরপর আমার সামনে একটাই লক্ষ্য, একটাই ‘ফাইনাল মিশন’—বিশ্বকাপ।’’
ব্রাজিলিয়ান ফুটবলের এই ‘পোস্টার বয়’ কি পারবেন তার শেষ মিশনে সফল হতে? উত্তর দেবে সময়, তবে আপাতত নেইমারের এই ফিরে আসা এবং হার না মানার মানসিকতা স্বপ্ন দেখাচ্ছে কোটি ভক্তকে।