জনপ্রিয় সংগীতশিল্পী জুবিন গর্গের মৃত্যুকে কেন্দ্র করে ঘনীভূত রহস্যের জট অবশেষে খুলতে শুরু করেছে। নিছক কোনো দুর্ঘটনা নয়, বরং ঠান্ডা মাথায় পরিকল্পিতভাবেই হত্যা করা হয়েছিল এই কিংবদন্তি শিল্পীকে—এমনই চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে এসেছে পুলিশের তদন্তে। মৃত্যুর তিন মাস পর আদালতে জমা পড়া ৩৫০০ পাতার দীর্ঘ চার্জশিট এবং ৪টি ট্রাঙ্ক ভর্তি প্রমাণ সেই ইঙ্গিতই দিচ্ছে।
শুক্রবার (১২ ডিসেম্বর), আসামের চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট (CJM) আদালত চত্বরে ছিল নজিরবিহীন নিরাপত্তা। আসাম পুলিশের বিশেষ তদন্তকারী দল বা Special Investigation Team (SIT) এদিন জুবিন গর্গ মৃত্যুর ঘটনার চূড়ান্ত চার্জশিট দাখিল করে। তবে সবার নজর কেড়েছে চার্জশিটের সঙ্গে জমা দেওয়া চারটি বড় ট্রাঙ্ক। পুলিশ সূত্রের খবর, এই ট্রাঙ্কগুলোর ভেতরেই রয়েছে এই মামলার মোড় ঘুরিয়ে দেওয়া সমস্ত নথিপত্র এবং Forensic Evidence।
দুর্ঘটনার আড়ালে ‘কোল্ড ব্লাডেড মার্ডার’?
গত ১৯ সেপ্টেম্বর সিঙ্গাপুরে থাকাকালীন জুবিন গর্গের মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়ে। প্রাথমিক পর্যায়ে প্রচার করা হয়েছিল, স্কুবা ডাইভিং (Scuba Diving) করতে গিয়ে এক মর্মান্তিক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন তিনি। কিন্তু সময় গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে সিআইডি এবং পরবর্তীতে গঠিত এসআইটি-র তদন্তে বেরিয়ে আসে লোমহর্ষক তথ্য।
তদন্তকারীরা নিশ্চিত হন, এটি কোনো স্বাভাবিক দুর্ঘটনা ছিল না, বরং এটি ছিল একটি সুপরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড বা Pre-planned Murder। আইনি প্রক্রিয়ায় প্রথমে ফৌজদারি ষড়যন্ত্র এবং অবহেলার অভিযোগ আনা হলেও, প্রমাণের ভিত্তিতে পরবর্তীতে যুক্ত করা হয় খুনের ধারা। পুলিশ জানিয়েছে, আদালতের নির্দেশে ট্রাঙ্কগুলোর ভেতরের প্রমাণাদি বিচার প্রক্রিয়ায় ধাপে ধাপে উন্মোচন করা হবে।
গ্রেফতার ৭: তদন্তের জালে ঘনিষ্ঠরা
জুবিন গর্গের মতো হাই-প্রোফাইল ব্যক্তির মৃত্যুর তদন্তে আসাম সরকার ডিজিপি এমপি গুপ্তার নেতৃত্বে একটি উচ্চপর্যায়ের এসআইটি গঠন করে। তদন্তে নেমে পুলিশ যাদের গ্রেফতার করেছে, তাদের পরিচয় জেনে রীতিমতো হতবাক ভক্তকুল। গায়কের একেবারে কাছের মানুষেরাই এই ষড়যন্ত্রের সঙ্গে যুক্ত বলে অভিযোগ।
এখন পর্যন্ত এই মামলায় ৭ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছেন সিঙ্গাপুর উৎসবের মূল আয়োজক শ্যামকানু মহন্ত এবং জুবিনের ম্যানেজার সিদ্ধার্থ শর্মা। ষড়যন্ত্রে লিপ্ত থাকার অভিযোগে গ্রেফতার হয়েছেন জুবিনের নিজের চাচাতো ভাই এবং আসাম পুলিশ সার্ভিসের অফিসার সন্দীপন গর্গ। এছাড়া জুবিনের ব্যান্ড সদস্য শেখর জ্যোতি গোস্বামী ও অমৃতপ্রভা মহন্ত এবং দুই ব্যক্তিগত নিরাপত্তারক্ষী (Personal Bodyguard) পরেশ বৈশ্য ও নন্দেশ্বর বোরাকেও হাজতে নেওয়া হয়েছে।
নিভে যাওয়া এক নক্ষত্র
জুবিন গর্গ শুধু একজন গায়ক ছিলেন না, তিনি ছিলেন একাধারে গীতিকার, সুরকার এবং মাল্টি-ইন্সট্রুমেন্টালিস্ট। ৪০টিরও বেশি ভাষায় গান গেয়ে তিনি নিজেকে এক অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গিয়েছিলেন। তার কণ্ঠে ২০,০০০-এর বেশি গান রেকর্ড করা হয়েছে। তবলা, গিটার, ড্রামস, ম্যান্ডোলিন থেকে শুরু করে ১২টি ভিন্ন ভিন্ন বাদ্যযন্ত্র বাজানোয় তিনি ছিলেন সমান পারদর্শী।
‘গ্যাংস্টার’ সিনেমার ‘ইয়া আলি’, ‘কৃশ থ্রি’-র ‘দিল তুহি বাতা’ কিংবা বাংলা সিনেমা ‘পরাণ যায় জলিয়ারে’-র মতো গানগুলো তাকে অমর করে রেখেছে। দুই বাংলার দর্শকদের কাছে তুমুল জনপ্রিয় এই শিল্পী ‘নিঃস্বার্থ ভালোবাসা’ সিনেমায় ‘ঢাকার পোলা’ গানটির মাধ্যমে বাংলাদেশেও ব্যাপক জনপ্রিয়তা পেয়েছিলেন। এমন একজন প্রতিভাবান শিল্পীর অস্বাভাবিক মৃত্যু এবং তার পেছনের এই ষড়যন্ত্রের খবর শোকস্তব্ধ করেছে তার কোটি ভক্তকে।