প্রকৃতিতে শীতের আমেজ শুরু হতেই অনেকের হাঁচি-কাশি, শ্বাসকষ্ট কিংবা ত্বকের চুলকানি বেড়ে যায়। চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় একে আলাদা কোনো রোগ হিসেবে চিহ্নিত না করা হলেও, পরিবেশগত পরিবর্তনের কারণে সৃষ্ট এই সমস্যাকে ‘উইন্টার অ্যালার্জি’ (Winter Allergy) বলা হয়। মূলত ঋতু পরিবর্তনের সাথে আমাদের জীবনযাপনের ধরন এবং চারপাশের পরিবেশের ভারসাম্য বদলে যাওয়াই এর প্রধান কারণ। কেন শীতকালে অ্যালার্জির প্রকোপ এতটা বৃদ্ধি পায়, তার পেছনে লুকিয়ে আছে কিছু গুরুত্বপূর্ণ বৈজ্ঞানিক ও পরিবেশগত ব্যাখ্যা।
১. শুষ্ক বাতাস ও শ্বাসনালির সংবেদনশীলতা
শীতকালে বাতাসে আর্দ্রতার পরিমাণ বা হিউমিডিটি (Humidity) নাটকীয়ভাবে কমে যায়। এই শুষ্ক ও ঠান্ডা বাতাস যখন আমাদের নাক ও মুখ দিয়ে ভেতরে প্রবেশ করে, তখন তা শ্বাসনালির ভেতরের আর্দ্র আস্তরণ বা মিউকাস মেমব্রেনকে শুকিয়ে ফেলে। ফলে শরীরের প্রাকৃতিক প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা দুর্বল হয়ে পড়ে এবং বাইরের অ্যালার্জেন (Allergens) সহজেই আক্রমণ করতে পারে।
২. ইনডোর অ্যালার্জেন ও বদ্ধ পরিবেশ
শীতের তীব্রতা থেকে বাঁচতে আমরা সাধারণত ঘরের জানালা-দরজা বন্ধ রাখি। এর ফলে ঘরের ভেতরের বাতাস চলাচলের পথ রুদ্ধ হয়ে যায়। দীর্ঘক্ষণ ঘর বদ্ধ থাকায় কার্পেট, সোফা বা পর্দার কোণে জমে থাকা ধূলিকণা, ডাস্ট মাইট (Dust Mites) এবং পোষা প্রাণীর লোম বাতাসের সাথে মিশে আমাদের ফুসফুসে প্রবেশ করে। এই ‘ইনডোর পলিউশন’ শীতকালীন অ্যালার্জির অন্যতম প্রধান কারণ।
৩. ভাইরাল ইনফেকশন ও রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা
শীতকালে রাইনোভাইরাস বা ইনফ্লুয়েঞ্জার মতো ভাইরাল ইনফেকশন (Viral Infection) প্রকট আকার ধারণ করে। ঘন ঘন সর্দি-কাশি বা জ্বরের কারণে শরীরের ইমিউন সিস্টেম বা রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা সাময়িকভাবে দুর্বল হয়ে পড়ে। এই দুর্বলতার সুযোগে সামান্য ধূলিকণা বা ঠান্ডাতেও শরীরে তীব্র অ্যালার্জি প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়।
৪. ত্বক ও শ্লেষ্মা ঝিল্লির সুরক্ষা কবচ হারানো
আমাদের ত্বক এবং নাকের ভেতরের শ্লেষ্মা ঝিল্লি অ্যালার্জেনের বিরুদ্ধে প্রথম প্রতিরক্ষা স্তর হিসেবে কাজ করে। কিন্তু শীতের শুষ্কতা এই স্তরে ফাটল ধরায়। ত্বক যখন অতিরিক্ত শুষ্ক (Dry Skin) হয়ে যায়, তখন তা বাইরের বিষাক্ত কণা বা জীবাণু আটকাতে ব্যর্থ হয়, যা থেকে একজিমা বা আর্টিকারিয়ার মতো চর্মরোগ দেখা দিতে পারে।
৫. বায়ুদূষণ ও কুয়াশার মিশ্রণ (Smog)
শীতকালে বায়ুমণ্ডলের নিচের স্তরে ধূলিকণা ও ধোঁয়া আটকা পড়ে থাকে, যাকে বিজ্ঞানের ভাষায় ‘টেম্পারেচার ইনভার্সন’ বলা হয়। কুয়াশা ও যানবাহনের বিষাক্ত ধোঁয়া মিলে তৈরি হয় স্মোগ (Smog)। এই দূষিত কণাগুলো বাতাসে দীর্ঘক্ষণ ভেসে থাকে এবং নিশ্বাসের সাথে শরীরে প্রবেশ করে সাইনোসাইটিস বা দীর্ঘমেয়াদী অ্যালার্জি তৈরি করে।
৬. শীতবস্ত্র ও পুরোনো কম্বলের প্রভাব
দীর্ঘদিন ট্রাঙ্ক বা আলমারিতে তুলে রাখা লেপ, কম্বল কিংবা উলের সোয়েটারে প্রচুর পরিমাণে ডাস্ট মাইট ও ছত্রাক (Mold) বাসা বাঁধে। ব্যবহারের আগে এগুলো ভালো করে রোদ না দিলে বা পরিষ্কার না করলে, শরীরে ছোঁয়া লাগার সাথে সাথেই অ্যালার্জি প্রতিক্রিয়া শুরু হয়। বিশেষ করে উলের ক্ষুদ্র তন্তু অনেক সময় ফুসফুসে গিয়ে শ্বাসকষ্ট বাড়িয়ে দেয়।
শীতকালীন অ্যালার্জির ঝুঁকিতে কারা বেশি? যদিও অ্যালার্জি যে কারো হতে পারে, তবে নির্দিষ্ট কিছু গোষ্ঠী এই সময়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়েন:
হাঁপানি বা অ্যাজমা রোগী: যাদের আগে থেকেই ফুসফুসের সমস্যা আছে।
শিশু ও বয়স্করা: যাদের রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা তুলনামূলক কম।
সাইনোসাইটিস আক্রান্ত ব্যক্তি: যাদের নাকের হাড় বাঁকা বা দীর্ঘদিনের সাইনাস সমস্যা রয়েছে।
প্রতিরোধের উপায় কী?
বিশেষজ্ঞদের মতে, শীতে অ্যালার্জি থেকে বাঁচতে প্রচুর পানি পান করা, ত্বক ময়েশ্চারাইজড রাখা এবং ঘর নিয়মিত পরিষ্কার রাখা জরুরি। বাইরে বের হওয়ার সময় মাস্ক ব্যবহার করা এবং শীতবস্ত্র ব্যবহারের আগে কড়া রোদে শুকিয়ে নেওয়া কার্যকর প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা হতে পারে।