বলিউডের ইতিহাসে কাল্ট ক্লাসিকের তালিকায় যে নামগুলো সবার আগে আসে, তার মধ্যে অন্যতম ‘মুন্না ভাই’ ফ্র্যাঞ্চাইজি। ২০০৩ সালে ‘মুন্না ভাই এমবিবিএস’ এবং ২০০৬ সালে ‘লাগে রাহো মুন্না ভাই’— এই দুই ছবির মাধ্যমে পর্দায় সঞ্জয় দত্ত ও আরশাদ ওয়ারসির যে রসায়ন তৈরি হয়েছিল, তা আজও দর্শকদের হৃদয়ে অমলিন। গত ১৯ বছর ধরে ভক্তরা অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছেন এই জুটিকে ফের বড় পর্দায় দেখার জন্য। কেন দেড় দশক পার হয়ে গেলেও অধরা থেকে গেল ‘মুন্না ভাই ৩’? সম্প্রতি এক সাক্ষাৎকারে সেই রহস্যের জট খুললেন খোদ ‘সার্কিট’ তথা আরশাদ ওয়ারসি।
‘মুন্না ভাই চলে আমেরিকা’ এবং এক অদ্ভুত সমাপতন
দ্বিতীয় কিস্তির সাফল্যের পর পরিচালক রাজকুমার হিরানি কাজ শুরু করেছিলেন তৃতীয় পার্ট নিয়ে, যার নাম রাখা হয়েছিল ‘মুন্না ভাই চলে আমেরিকা’। আরশাদ ওয়ারসি জানান, ছবিটির চিত্রনাট্য থেকে শুরু করে প্রি-প্রডাকশনের কাজ প্রায় গুছিয়ে আনা হয়েছিল। কিন্তু মাঝপথে কাঁটা হয়ে দাঁড়ায় শাহরুখ খান অভিনীত করণ জোহরের ব্লকবাস্টার ছবি ‘মাই নেম ইজ খান’।
আরশাদের ভাষ্যমতে, “আমি যতদূর জানি, ‘মুন্না ভাই ৩’-এর মূল প্লটটি ‘মাই নেম ইজ খান’-এর গল্পের সঙ্গে আশ্চর্যজনকভাবে মিলে গিয়েছিল। হিরানির গল্পেও মুন্না এবং সার্কিটের মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে পাড়ি দেওয়া এবং শেষ পর্যন্ত মার্কিন প্রেসিডেন্টের সঙ্গে দেখা করার বিষয়টি ছিল। যখন দেখা গেল একই ঘরানার গল্প নিয়ে অন্য একটি বড় প্রজেক্ট মুক্তি পেয়েছে, তখন রাজকুমার হিরানি পিছিয়ে আসেন।”
মৌলিকত্ব বনাম রাজকুমার হিরানি: খুঁতখুঁতে পরিচালকের নীতি
বলিউডে রাজকুমার হিরানি পরিচিত তাঁর ‘Originality’ বা মৌলিকত্বের জন্য। তিনি নিজের সৃষ্টিকে অন্য কোনো ছবির ছায়ায় দেখতে পছন্দ করেন না। আরশাদ উদাহরণ দিয়ে বলেন, “হিরানি তাঁর কাজের ব্যাপারে আপসহীন। যখন তিনি জানতে পারেন ‘ওহ মাই গড’ ছবির বিষয়বস্তু তাঁর ভাবনার কাছাকাছি, তখন তিনি ‘পিকে’ (PK) ছবির দ্বিতীয় ভাগ বা সিক্যুয়েন্স অন্তত তিনবার নতুন করে লিখেছিলেন যাতে কোনো সাদৃশ্য না থাকে।” ঠিক একই কারণে ‘মুন্না ভাই চলে আমেরিকা’ প্রজেক্টটি স্থগিত রাখার সাহসী সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন পরিচালক।
হতাশার মাঝেও আশার আলো: হাতে তিনটি স্ক্রিপ্ট
দীর্ঘ ১৯ বছরের দীর্ঘশ্বাস কি তবে আরও দীর্ঘ হবে? এই প্রশ্নের উত্তরে আরশাদ ওয়ারসি কিছুটা স্বস্তির খবর দিয়েছেন। তিনি জানান, রাজকুমার হিরানি এই ফ্র্যাঞ্চাইজি নিয়ে কাজ থামিয়ে দেননি। বর্তমানে পরিচালকের ড্রয়ারে ‘মুন্না ভাই ৩’-এর জন্য অন্তত তিনটি আলাদা চিত্রনাট্য বা ‘Script’ তৈরি রয়েছে। তবে হিরানি ততক্ষণ পর্যন্ত সবুজ সংকেত দিচ্ছেন না, যতক্ষণ না তিনি শতভাগ নিশ্চিত হচ্ছেন যে এই গল্পটি আগের দুটি কিস্তির মান বজায় রাখতে পারবে।
সার্কিট হতে চাননি আরশাদ! কেরিয়ার নিয়ে ছিল গভীর সংশয়
সাক্ষাৎকারে আরশাদ তাঁর আইকনিক চরিত্র ‘সার্কিট’ নিয়ে এক অজানা তথ্য শেয়ার করেন। ১৯৯৬ সালে ‘তেরে মেরে স্বপ্নে’ দিয়ে আত্মপ্রকাশ করলেও বলিউডে স্থায়িত্ব পেতে লড়াই করছিলেন তিনি। যখন হিরানি তাঁকে সার্কিট চরিত্রের প্রস্তাব দেন, আরশাদ প্রথমে তা নাকচ করতে চেয়েছিলেন।
স্মৃতিচারণ করে অভিনেতা বলেন, “আমি আসলে ছোট কোনো পার্শ্বচরিত্রে অভিনয় করে নিজের কেরিয়ার শেষ করতে চাইনি। আমি পরিচালককে সরাসরি বলেছিলাম, ‘স্যর, আপনার কাছে যদি সত্যিই কোনো শক্তিশালী চরিত্র থাকে তবেই আমায় ডাকবেন। শুধু ভিড়ের মাঝে একজন হয়ে থাকলে আমার কেরিয়ার ধ্বংস হয়ে যাবে’।” তবে হিরানির জেদ এবং চরিত্রের গভীরতা বুঝতে পারার পর আরশাদ রাজি হন, যা শেষ পর্যন্ত তাঁর কেরিয়ারের মোড় ঘুরিয়ে দিয়েছিল।
বর্তমানে বলিপাড়ায় জোর গুঞ্জন, রাজকুমার হিরানি এবং সঞ্জয় দত্তের সাম্প্রতিক বৈঠকের পর হয়তো খুব শীঘ্রই ‘মুন্না ভাই ৩’-এর আনুষ্ঠানিক ঘোষণা আসতে পারে। ততক্ষণ পর্যন্ত দর্শকদের অপেক্ষা করতে হবে পর্দার প্রিয় ‘মুন্না-সার্কিট’ জুটির নতুন ম্যাজিকের জন্য।