টাইগার পেসার মোস্তাফিজুর রহমানকে কেন্দ্র করে ভারত ও বাংলাদেশের ক্রিকেটীয় ও রাজনৈতিক সম্পর্কের টানাপড়েন এখন চরমে। আইপিএল ২০২৬-এর নিলামে আকাশছোঁয়া দামে দল পাওয়ার পরও শেষ পর্যন্ত রাজনৈতিক চাপে মোস্তাফিজকে কলকাতা নাইট রাইডার্স (KKR) ছেড়ে দিতে বাধ্য হওয়ায় তীব্র প্রতিবাদ জানিয়েছেন বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশনের (বাফুফে) নবনির্বাচিত সভাপতি তাবিথ আউয়াল। ভারতীয় ক্রিকেট কন্ট্রোল বোর্ড (BCCI) এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে খেলাধুলাকে রাজনীতির ঊর্ধ্বে রাখার জোরালো আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।
তাবিথ আউয়ালের ফেসবুক প্রতিবাদ ও কড়া হুঁশিয়ারি
রবিবার (৪ জানুয়ারি) নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে দেওয়া এক বিবৃতিতে তাবিথ আউয়াল মোস্তাফিজুর রহমানের প্রতি সংহতি প্রকাশ করেন। তিনি অভিযোগ করেন, কেবলমাত্র রাজনৈতিক স্বার্থসিদ্ধির জন্য একজন প্রতিভাবান খেলোয়াড়ের কেরিয়ার নিয়ে ছিনিমিনি খেলা হচ্ছে। তাবিথ লেখেন, “আইপিএল ২০২৬ থেকে মোস্তাফিজুর রহমানকে কেবল রাজনৈতিক চাপের কারণে বাদ দেওয়া হয়েছে জেনে আমি অত্যন্ত হতাশ। এটি কেবল একজন ক্রিকেটারের ওপর অবিচার নয়, বরং জাতীয়তার ভিত্তিতে কাউকে টার্গেট করা অসহিষ্ণুতার চরম বহিঃপ্রকাশ।”
তিনি আরও উল্লেখ করেন যে, ক্রিকেটকে ‘জেন্টলম্যানস গেম’ (Gentleman's Game) বলা হলেও বর্তমান পরিস্থিতিতে সেই গরিমা ক্ষুণ্ণ হচ্ছে। তিনি বিসিসিআই-এর প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেন, “খেলাধুলাকে রাজনীতিকরণ (Sports Politicization) করা বন্ধ করুন এবং বিশ্ব ক্রীড়াঙ্গনের আদর্শ বজায় রাখুন।”
নিলামের উত্তাপ থেকে মাঠের বাইরে বিক্ষোভ
উল্লেখ্য, গত নিলামে ৯ কোটি ২০ লাখ রুপির বিনিময়ে মোস্তাফিজুর রহমানকে দলে ভিড়িয়েছিল কলকাতা নাইট রাইডার্স। কিন্তু এই দলবদলের পরপরই ভারতের একটি কট্টরপন্থী অংশ বাংলাদেশে ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের ওপর কথিত নির্যাতনের অভিযোগ তুলে মোস্তাফিজকে আইপিএল থেকে বাদ দেওয়ার দাবি জানায়। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছায় যে, উগ্রপন্থীরা আইপিএলের মাঠ ভাঙচুর এবং ম্যাচ পণ্ড করার হুঁশিয়ারি দেয়। এই অস্থিরতার মুখে বিসিসিআই ফ্র্যাঞ্চাইজি দল কলকাতাকে নির্দেশ দেয় মোস্তাফিজকে স্কোয়াড থেকে রিলিজ (Release) করে দেওয়ার জন্য।
নিরাপত্তা ঝুঁকি ও বিশ্বকাপ বর্জনের জোরালো সম্ভাবনা
মোস্তাফিজের ওপর এই অনাকাঙ্ক্ষিত চাপ এবং ভারতীয় কর্তৃপক্ষের নতি স্বীকারের ঘটনা দুই দেশের ক্রীড়া সম্পর্কে গভীর ক্ষত তৈরি করেছে। প্রশ্ন উঠেছে বাংলাদেশের জাতীয় দলের নিরাপত্তা নিয়েও। মোস্তাফিজের মতো একজন তারকা খেলোয়াড়কে নিরাপত্তা দিতে ভারত ব্যর্থ হলে, পুরো বাংলাদেশ দলকে আসন্ন বিশ্বকাপে কতটা নিরাপত্তা দিতে পারবে—সেই বিতর্ক এখন তুঙ্গে।
এই সংকটের প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের ক্রীড়া উপদেষ্টা আসিফ নজরুল ইতিমধ্যে একটি বিস্ফোরক মন্তব্য করেছেন। তিনি স্পষ্ট জানিয়েছেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে নিরাপত্তা ঝুঁকি (Security Risk) বিবেচনা করে বাংলাদেশ দল ভারত সফরে গিয়ে বিশ্বকাপ না খেলার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। বিসিবি (BCB) বর্তমানে ভারতের বিকল্প হিসেবে শ্রীলঙ্কায় বিশ্বকাপের ম্যাচগুলো আয়োজনের ব্যাপারে আইসিসির সঙ্গে আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছে।
ক্রীড়াঙ্গনে বৈশ্বিক প্রভাব ও কূটনৈতিক সংকট
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, আইপিএলের মতো একটি গ্লোবাল লিগে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপের এই নজির আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে ভারতের Market Value এবং ভাবমূর্তিকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে। খেলোয়াড়দের পেশাদারিত্ব এবং নিরাপত্তার গ্যারান্টি না থাকলে বিশ্বের অন্যান্য দেশের খেলোয়াড়রাও ভবিষ্যতে ভারতে খেলতে আসার ব্যাপারে সন্দিহান হয়ে উঠতে পারেন। তাবিথ আউয়ালের এই প্রতিবাদ কেবল দেশের ক্রীড়াঙ্গনের কণ্ঠস্বর নয়, বরং আন্তর্জাতিকভাবে ভারতের স্পোর্টস ম্যানেজমেন্টের ওপর একটি বড় প্রশ্নচিহ্ন।