পর্যবেক্ষক দলের ভূমিকা ও কর্মপরিধি
সংশ্লিষ্ট নির্ভরযোগ্য সূত্র জানিয়েছে, চীনের এই দুই পর্যবেক্ষক নির্বাচনের আগেই বাংলাদেশে আসবেন এবং ভোটগ্রহণ প্রক্রিয়া সরাসরি পর্যবেক্ষণ করবেন। ঢাকায় চীনা দূতাবাসের কর্মকর্তারা একটি টিমের মাধ্যমে এই পর্যবেক্ষকদের সঙ্গে মিলে নির্বাচন পর্যবেক্ষণে কাজ করবেন। নির্বাচন কমিশনের (ইসি) গাইডলাইন অনুসারে, বিদেশি পর্যবেক্ষকরা নির্বাচনের সব পর্যায়—প্রাক-নির্বাচনী প্রস্তুতি, প্রচার, ভোট গ্রহণ, গণনা ও ফল ঘোষণা—পর্যবেক্ষণ করার সুযোগ পাবেন। বর্তমানে নির্বাচন কমিশন এবং পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে বিদেশি পর্যবেক্ষকদের অ্যাক্রেডিটেশন প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে।
ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট ও চীনের কৌশল
২০২৪ সালের দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে চীন প্রথমবারের মতো অফিসিয়ালি তিনজন পর্যবেক্ষক পাঠিয়েছিল। সেবার পশ্চিমা দেশগুলো (ইইউ, যুক্তরাষ্ট্র) পূর্ণাঙ্গ মিশন না পাঠালেও চীন, রাশিয়া, জাপানের মতো এশীয় শক্তিগুলো ছোট দল পাঠিয়ে নির্বাচনকে সমর্থন জানিয়েছিল। এবারও ছোট কিন্তু অফিসিয়াল দল পাঠিয়ে চীন বাংলাদেশের ভূ-রাজনীতিতে তাদের গুরুত্ব ও উপস্থিতি জানান দিতে চাইছে। পর্যবেক্ষকরা ২০২৪-এর নির্বাচনে নির্বাচনকে ‘সুষ্ঠু, অবাধ ও স্বচ্ছ’ বলে মন্তব্য করেছিলেন, যা চীনের অ-হস্তক্ষেপ নীতির প্রতিফলন।
চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র লিন জিয়ান সম্প্রতি বলেছেন, ‘বাংলাদেশের সাধারণ নির্বাচন বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়। চীন অন্য দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ করে না। আমরা আশা করি, অন্তর্বর্তী সরকার ও বাংলাদেশের জনগণ নিজেদের বিষয় ভালোভাবে সামলাতে পারবে এবং সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে’।
কৌশলগত আগ্রহের কারণ
চীন-বাংলাদেশ সম্পর্কের প্রেক্ষাপটে এই সিদ্ধান্ত খুবই গুরুত্বপূর্ণ। বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ (বিআরআই), অবকাঠামো প্রকল্প, ঋণ, বাণিজ্য ও প্রতিরক্ষা সহযোগিতায় চীন বাংলাদেশের অন্যতম বড় অংশীদার। ২০২৪-এর পর থেকে চীন বাংলাদেশের রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ বাড়িয়েছে। সর্বশেষ বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমানের সঙ্গেও ঢাকায় নিযুক্ত চীনের রাষ্ট্রদূত বৈঠক করেন। মূলত এই পর্যবেক্ষক পাঠানো চীনের কৌশলগত আগ্রহের অংশ, যাতে নির্বাচন-পরবর্তী সরকারের সঙ্গে সম্পর্ক আরও মজবুত হয়।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক ওবায়দুল হক এই বিষয়ে মন্তব্য করেন, চীনের এই আগ্রহ বিশ্ব রাজনীতির পরিবর্তিত গতিপথের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে চলার প্রয়াস। তিনি বলেন, ‘এটি পশ্চিমা দেশগুলোর প্রতিও একটি কৌশলগত বার্তা হতে পারে; কারণ ঐতিহ্যগতভাবে নির্বাচন পর্যবেক্ষণে পশ্চিমাদের প্রাধান্য থাকলেও চীন এখন সেখানে নিজেদের উপস্থিতি দৃশ্যমান করে যুক্তরাষ্ট্রের মতো প্রতিদ্বন্দ্বীদের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় নামতে চাইছে’। তিনি আরও উল্লেখ করেন, বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ও সামাজিক উন্নয়ন প্রকল্পে চীনের বিপুল বিনিয়োগ থাকায় তারা রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখার জন্য নির্বাচনকে নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে।
গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় পর্যবেক্ষণের গুরুত্ব
অন্তর্বর্তী সরকারের অধীনে এই নির্বাচন বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়াকে নতুন করে প্রতিষ্ঠিত করার সুযোগ দিচ্ছে। ২০২৪-এর অভ্যুত্থানের পর থেকে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার ও আন্তর্জাতিক সমর্থনের প্রয়োজনীয়তা বেড়েছে। চীনের মতো দেশের পর্যবেক্ষক পাঠানো নির্বাচনের বিশ্বাসযোগ্যতা বাড়াতে সাহায্য করবে, বিশেষ করে যখন পশ্চিমা দেশগুলোর পাশাপাশি এশিয়ান শক্তিগুলোর অংশগ্রহণ বাড়ছে। তবে চীনে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা না থাকায় তাদের গণতান্ত্রিক দেশে নির্বাচন পর্যবেক্ষণ করতে আসাটা কূটনৈতিক গুরুত্বের ওপরই নির্ভরশীল।