চাকরি জীবন থেকে নতুন উদ্যম
২০০৮ সালে ঢাকায় মাত্র ১৫ হাজার টাকা বেতনে একটি কলসেন্টারে কাজ শুরু করেন মারিয়া রে। তবে ব্যবসার প্রতি তাঁর প্রবল আগ্রহ থাকায় দিনের কাজ সারতে তিনি রাতেও শিফট করতেন। সেসময় তিনি বিউটি পার্লার ও কাপড়ের ব্যবসাও করতেন। পরে একটি অ্যান্টিভাইরাস কোম্পানির বিপণন ব্যবস্থাপক হিসেবে দুই বছর কাজ করেন। ২০১৮ সালে স্বামীর চাকরির কারণে তিনি কক্সবাজারে চলে আসেন।
রেস্তোরাঁ থেকে শৈবাল পণ্য
রন্ধনশিল্পী বাবার কারণে ছোটবেলা থেকেই রান্নার প্রতি মারিয়ার বিশেষ আগ্রহ ছিল। প্রতিবেশী ও বন্ধুমহলে তাঁর রান্নার সুনাম ছড়িয়ে পড়লে ২০১৯ সাল থেকে তিনি অনলাইনে ক্লাউড কিচেন চালু করেন। এরপর ২০২২ সালে কক্সবাজারের লাবণী বিচ পয়েন্টে ‘স্টারিনাস কিচেন’ নামে একটি সি-ফুড রেস্তোরাঁ খোলেন। পর্যটন মৌসুমে প্রতি মাসে রেস্তোরাঁয় প্রায় পাঁচ লাখ টাকার ব্যবসা হয়। ২০২২ সালে শাশুড়ির বন্ধুর মাধ্যমে বিদেশ থেকে আনা শুকনা সামুদ্রিক শৈবাল দেখে তিনি দেশে এটি নিয়ে কাজ করার অনুপ্রেরণা পান। শৈবালে থাকা পুষ্টিগুণ ও এটি রান্নায় ব্যবহারের সম্ভাবনা তাঁকে বিশেষভাবে আকর্ষণ করে।
শৈবাল চাষে নতুন দিগন্ত
প্রথমে তিনি স্থানীয়ভাবে সামুদ্রিক শৈবাল সংগ্রহ করে তা থেকে শুকনা গুঁড়া ও সাবান তৈরি করে বিক্রি শুরু করেন। ২০২৫ সালে তিনি প্রায় দুই লাখ টাকার শৈবাল-পণ্য বিক্রি করেন। ক্রেতাদের ব্যাপক আগ্রহ দেখে গত নভেম্বরে কক্সবাজারের নুনিয়াছড়া এলাকায় প্রায় দেড় একর জমিতে নিজেই বাণিজ্যিক ভিত্তিতে শৈবাল চাষ শুরু করেন। তিনি উলভা ও গ্র্যাসেলেরিয়া প্রজাতির শৈবাল চাষ করছেন। গ্র্যাসেলেরিয়া শৈবালের বীজ স্থানীয়ভাবে সংগ্রহ করা হয় এবং উলভার বীজ কক্সবাজার কৃষি গবেষণা কেন্দ্র থেকে নেওয়া হয়। বর্তমানে ছয়টি জেলে পরিবারের নারী সদস্যরা এই চাষের সঙ্গে যুক্ত।
উৎপাদন ও বিক্রির লক্ষ্যমাত্রা
সামুদ্রিক শৈবাল চাষের জন্য সমুদ্রের পানির লবণাক্ততা ও আবহাওয়া খুব গুরুত্বপূর্ণ। তাই প্রতিবছর নভেম্বর থেকে এপ্রিল মাস পর্যন্ত এই চাষ করা হয়। এক মাস অন্তর শৈবাল সংগ্রহ করা যায়। চলতি মৌসুমে মারিয়ার লক্ষ্য হলো ২৪ টন উলভা শৈবাল এবং ৫০০ কেজি গ্র্যাসেলেরিয়া শৈবাল উৎপাদন করা। এই কাঁচা শৈবাল থেকে প্রায় দুই টন শুকনা শৈবাল তৈরির লক্ষ্য রয়েছে তাঁর। সবমিলিয়ে চলতি বছর তাঁর প্রায় ৩০ লাখ টাকার শৈবাল বিক্রির আশা। বর্তমানে তিনি 'সি ফরেস্ট বিডি' (Sea Forest BD) নামে ফেসবুক ও ওয়েবসাইটের মাধ্যমে পণ্য বিক্রি করছেন।
পুষ্টিগুণ ও ব্যবহার
মারিয়া রে জানান, সামুদ্রিক শৈবালকে 'সুপারফুড' বলা হয়, কারণ এতে অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট, অ্যান্টি-এজিং উপাদান এবং বিভিন্ন ভিটামিন ও খনিজ পদার্থ থাকে। এই প্রাকৃতিক শৈবাল কাঁচাও খাওয়া যায় এবং শুকিয়ে পাউডার বা নির্যাস হিসেবে খাবার, প্রসাধনী ও ওষুধ শিল্পে ব্যবহৃত হচ্ছে। এটি শিশু ও অন্যদের আয়োডিনের ঘাটতি পূরণসহ নারীদের পুষ্টির চাহিদা মেটাতে সাহায্য করে। এছাড়া জৈব সার ও পশুর খাবার হিসেবেও এর ব্যবহার রয়েছে।