বাস্তবতার নতুন সংজ্ঞা ও অন্ধকার প্রবৃত্তির প্রতিফলন বাস্তব জীবনে মানুষ জটিল, বিপরীতমুখী আবেগ আর নানা দোষ-গুণে ভরা। বলিউড অবশেষে এই সত্যকে স্বীকার করে নিয়ে পর্দায় তাকে ফুটিয়ে তুলছে, কোনো রকম রঙিন মোড়ক ছাড়াই। এখন নায়ককে 'আদর্শ' হিসেবে দেখানোর দরকার নেই। বরং এমন চরিত্র সামনে আসছে, যা মানুষের ভেতরের অপ্রিয় ও অন্ধকার প্রবৃত্তিকে তুলে ধরে। এই চরিত্রগুলো সিনেমার খাতিরে কোনো রকম ছলচাতুরী বা নৈতিকতার আশ্রয় নেয় না।
'কবীর সিং'-এর মাধ্যমে নতুন ধারার সূচনা ২০১৯ সালে মুক্তি পাওয়া 'কবীর সিং' হিন্দি সিনেমায় এক নতুন ধারার সূচনা করে। শাহিদ কাপুর অভিনীত সার্জন কবীর সিং ছিল এক ধ্বংসাত্মক, বা বলা ভালো 'বিষাক্ত' চরিত্র। কিন্তু চরিত্রটির খোলামেলা আবেগীয় প্রকাশ দর্শকদের কাছে খুবই আকর্ষণীয় হয়ে ওঠে। এটি 'হাম আপকে হ্যায় কৌন'-এর প্রেম বা 'দিল তো পাগল হ্যায়'-এর রাহুলের মতো ঐতিহ্যবাহী নায়কদের থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন। কবীর সিংয়ের আকর্ষণ তাঁর নৈতিকতায় ছিল না, ছিল তাঁর আবেগপ্রবণতায়। কর্মজীবনে সফল হলেও ব্যক্তিগত জীবনে তিনি বিপর্যয়ে পর্যুদস্ত। সিনেমা তাঁর আচরণকে সমর্থন না করলেও, চরিত্রটিকে সহজভাবে মেনে নিতে সাহায্য করে। এই দৃষ্টিভঙ্গিই প্রমাণ করেছে যে দর্শকেরা এখন নিখুঁত নায়ক নয়, বরং বিতর্কিত চরিত্রের প্রতি বেশি আকৃষ্ট। দর্শকেরা এই অসম্পূর্ণ চরিত্রের প্রতিও সমর্থন জানিয়েছে, যা নতুন প্রজন্মের নায়কদের পথ তৈরি করে দিয়েছে।
'অ্যানিমেল' এবং পরবর্তী উদাহরণ 'কবীর সিং' থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে নির্মাতা সন্দীপ রেড্ডি ভাঙ্গা তাঁর পরবর্তী ছবি 'অ্যানিমেল'-এ এই ধারাকে আরও এক ধাপ এগিয়ে নিয়ে যান। রণবীর কাপুর অভিনীত এই চরিত্রটি ব্যাপক সমালোচিত হলেও ছবিটি বিশ্বব্যাপী ৯০০ কোটি রুপি আয় করে। 'অ্যানিমেল' দেখিয়েছে যে কীভাবে প্রধান চরিত্রকে নৃশংসভাবে উপস্থাপন করেও দর্শকদের প্রেক্ষাগৃহে আনা যায়। গত বছরের আরেকটি আলোচিত সিনেমা 'ধুরন্ধর', যেখানে রণবীর সিং একজন নৃশংস ও অনিয়ন্ত্রিত ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থার এজেন্টের চরিত্রে অভিনয় করেন, সেই পথে হেঁটেছে। এটি আবারও প্রমাণ করে যে দর্শকরা এখন নায়কের কাছ থেকে নৈতিকতার শিক্ষা নয়, বরং পর্দায় বাস্তবতার ছোঁয়া চান। সিনেমাটি বিশ্বব্যাপী ১ হাজার ২০০ কোটি রুপি আয় করেছে।
বলিউডে দক্ষিণী সিনেমার প্রভাব এই 'নৃশংস' নায়কের ধারাকে অনুসরণ করার পাশাপাশি দক্ষিণী সিনেমা বলিউডের জন্য পথপ্রদর্শকও হয়েছে। 'অর্জুন রেড্ডি' (যা 'কবীর সিং'-এর রিমেক), 'কেজিএফ', 'পুষ্পা', 'কাতরু ভেলিয়াদাই', 'লাভ' ও 'লাইগার'-এর মতো সিনেমাগুলো প্রমাণ করেছে যে নায়কেরা খারাপ বা ভয়ংকর হলেও গল্পের কেন্দ্রে থাকতে পারে।
ওটিটি প্ল্যাটফর্মের ভূমিকা ও ভবিষ্যৎ প্রবণতা ওয়েব প্ল্যাটফর্মের উত্থানও নায়কদের 'নৃশংস' হওয়ার প্রবণতাকে প্রভাবিত করেছে। গত কয়েক বছরে মুক্তিপ্রাপ্ত অনেক ভারতীয় ওয়েব সিরিজ ও সিনেমায় এ ধরনের অ্যান্টি-হিরো চরিত্র দেখা গেছে। উদাহরণস্বরূপ, 'দাহাড়' ওয়েব সিরিজে বিজয় ভার্মা অভিনীত সিরিয়াল কিলারের চরিত্রটি উল্লেখ করা যায়।
একই ধরনের চরিত্রে বারবার নায়কদের হাজির করা হলে একঘেয়েমি আসতে পারে, তাই নির্মাতারা এখন নতুন ছবিতে বৈচিত্র্য আনার চেষ্টা করছেন। নায়কদের নৃশংসতা আরও বিশ্বাসযোগ্য করে তুলতে তাদের পুলিশ বা গুপ্তচরের মতো চরিত্রে দেখা যাচ্ছে। এই ধরনের সিনেমাগুলো অতিমাত্রায় পুরুষতান্ত্রিক ও নারী চরিত্রকে হেয় করে দেখানোর অভিযোগ সত্ত্বেও, যেহেতু এগুলি ব্যবসায়িকভাবে অত্যন্ত সফল, তাই নির্মাতারা সমালোচনায় কান দিচ্ছেন না।