বিশ্ব রাজনীতি ও অর্থনীতির পারদ চড়তেই তার সরাসরি প্রভাব পড়েছে আন্তর্জাতিক পণ্য বাজারে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সাম্প্রতিক এক বিতর্কিত হুঁশিয়ারিকে কেন্দ্র করে বিশ্ববাজারে স্বর্ণ ও রুপার দামে সৃষ্টি হয়েছে নতুন ইতিহাস। সোমবার (১৯ জানুয়ারি) লেনদেনের শুরুতেই মূল্যবান এই ধাতু দুটির দাম লাফিয়ে লাফিয়ে বেড়ে রেকর্ড উচ্চতায় পৌঁছেছে। বার্তা সংস্থা রয়টার্সের এক প্রতিবেদনে এই চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে এসেছে।
রেকর্ড উচ্চতায় স্পট মার্কেট ও ফিউচার ট্রেডিং
বাজার বিশ্লেষণে দেখা যায়, সোমবার আন্তর্জাতিক স্পট মার্কেটে (Spot Market) স্বর্ণের দাম ১.৫ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়ে প্রতি আউন্স ৪ হাজার ৬৬৩.৩৭ ডলারে দাঁড়িয়েছে। দিনের শুরুতে এটি ৪ হাজার ৬৮৯.৩৯ ডলারের মাইলফলক স্পর্শ করে, যা ইতিহাসের সর্বোচ্চ। অন্যদিকে, মার্কিন স্বর্ণ ফিউচার (US Gold Futures) ১.৬ শতাংশ বেড়ে প্রতি আউন্স ৪ হাজার ৬৬৯.৯০ ডলারে লেনদেন হচ্ছে। শুধু স্বর্ণই নয়, শিল্পক্ষেত্রে ব্যবহৃত রুপার দামও ৩.৩ শতাংশ বেড়ে প্রতি আউন্স ৯২.৯৩ ডলারে পৌঁছেছে, যা আগের সেশনে রেকর্ড ৯৪.০৮ ডলারে উঠেছিল।
নেপথ্যে ট্রাম্পের ‘গ্রিনল্যান্ড’ ইস্যু ও শুল্ক হুমকি
বিশ্লেষকদের মতে, এই অস্থিরতার মূলে রয়েছে ডোনাল্ড ট্রাম্পের ভূ-রাজনৈতিক পদক্ষেপ। গ্রিনল্যান্ড ক্রয়ের প্রচেষ্টায় বাধা পাওয়ায় ইউরোপীয় দেশগুলোর ওপর অতিরিক্ত শুল্ক (Tariff) আরোপের হুমকি দিয়েছেন ট্রাম্প। গত শনিবার তিনি ঘোষণা করেন, যতক্ষণ না যুক্তরাষ্ট্র ডেনমার্কের এই বিশাল দ্বীপটি কেনার অনুমতি পাচ্ছে, ততক্ষণ ইউরোপীয় মিত্রদের ওপর শাস্তিমূলক শুল্ক আরোপ করা হবে। ডেনমার্ক ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের সাথে এই বিরোধ তীব্র হওয়ায় বিনিয়োগকারীরা ঝুঁকি এড়াতে তাদের পুঁজি শেয়ার বাজার থেকে সরিয়ে ‘নিরাপদ সম্পদ’ বা Safe Haven হিসেবে পরিচিত স্বর্ণ ও রুপার দিকে সরিয়ে নিচ্ছেন।
বিনিয়োগকারীদের আচরণ ও বৈশ্বিক প্রভাব
স্টোনএক্সের (StoneX) সিনিয়র বিশ্লেষক ম্যাট সিম্পসন এই পরিস্থিতি ব্যাখ্যা করে বলেন, “ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনা স্বর্ণের দাম বাড়ার প্রধান অনুঘটক হিসেবে কাজ করছে। ট্রাম্পের শুল্ক হুমকি এখন আর কেবল মৌখিক নয়, এটি ন্যাটো এবং ইউরোপের মধ্যে বিদ্যমান রাজনৈতিক ভারসাম্যহীনতাকে আরও প্রকট করে তুলছে।”
এই পরিস্থিতির প্রভাবে বিশ্বজুড়ে ডলারের আধিপত্যে কিছুটা ভাটা পড়েছে এবং মার্কিন স্টক ফিউচারের দাম নিম্নমুখী হয়েছে। অনিশ্চয়তার এই সময়ে বিনিয়োগকারীরা জাপানি ইয়েন এবং সুইস ফ্রাঙ্কের মতো স্থিতিশীল মুদ্রার প্রতিও আগ্রহী হয়ে উঠছেন। সাধারণত যখন সুদের হার কম থাকে বা বৈশ্বিক অনিশ্চয়তা বৃদ্ধি পায়, তখন স্বর্ণের মতো অ-ফলনশীল (Non-yielding) সম্পদগুলো সবচাইতে ভালো রিটার্ন দেয়।
অন্যান্য ধাতুর বাজার পরিস্থিতি
স্বর্ণ ও রুপার পাশাপাশি অন্যান্য মূল্যবান ধাতুর দামও ঊর্ধ্বমুখী। বিশ্ববাজারে স্পট প্লাটিনামের দাম ০.৯ শতাংশ বেড়ে প্রতি আউন্স ২ হাজার ৩৪৮.৩২ ডলারে দাঁড়িয়েছে। এছাড়া প্যালাডিয়ামের দাম ০.৫ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়ে প্রতি আউন্স ১ হাজার ৮০৮.৪৬ ডলারে বেচাকেনা হচ্ছে।
ওসিবিসি (OCBC) এর কৌশলবিদ ক্রিস্টোফার ওং-এর মতে, ২০২৫ সালের শেষ নাগাদ স্বর্ণ ও রুপার অনুপাত (Gold-Silver Ratio) উল্লেখযোগ্য হারে পরিবর্তিত হতে পারে। রুপার শক্তিশালী শিল্প চাহিদা এবং নিরাপদ আশ্রয়ের প্রয়োজনীয়তার কারণে দীর্ঘমেয়াদে এর বাজার বেশ ইতিবাচক। তবে বর্তমানের এই আকস্মিক উত্থান বিনিয়োগকারীদের কিছুটা সতর্কভাবে পা ফেলার ইঙ্গিত দিচ্ছে।
ভূ-রাজনৈতিক এই অস্থিরতা যদি দীর্ঘায়িত হয়, তবে বিশ্ববাজারে স্বর্ণ ও রুপার দাম আরও কত নতুন রেকর্ড সৃষ্টি করবে, তা নিয়ে এখন চলছে ব্যাপক জল্পনা।