পাকিস্তানের সিন্ধু প্রদেশের রাজধানী তথা বাণিজ্যিক কেন্দ্র করাচির আকাশ এখনো কালো ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন। শহরের অন্যতম বৃহৎ বাণিজ্যিক কেন্দ্র ‘গুল প্লাজা’ শপিং মলে লাগা ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে এখন পর্যন্ত ১৪ জনের মৃত্যু নিশ্চিত করা হয়েছে। মর্মান্তিক এই ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন কর্তব্যরত এক দমকলকর্মীও। তবে নিহতের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে, কারণ অগ্নিকাণ্ডের পর থেকে এখন পর্যন্ত অন্তত ৫৮ জন নিখোঁজ রয়েছেন বলে তাঁদের পরিবার দাবি করেছে।
২৪ ঘণ্টার লড়াই ও ধ্বংসস্তূপের বর্তমান পরিস্থিতি
গত শনিবার (১৭ জানুয়ারি) রাতে গুল প্লাজায় আগুনের সূত্রপাত হয়। প্রায় ৮ হাজার বর্গফুট এলাকা জুড়ে বিস্তৃত এই বিশাল ‘Shopping Mall’-এ ১২০০-এরও বেশি দোকান ছিল। করাচির ‘Rescue 1122’-এর মুখপাত্র হাসান খান জানিয়েছেন, মলের ভেতরে প্লাস্টিক ফোম, গার্মেন্টস পণ্য এবং পারফিউমের মতো উচ্চমাত্রার দাহ্য পদার্থ বা ‘Flammable Materials’ মজুত থাকায় আগুন অত্যন্ত দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। দমকল বাহিনীর কয়েক ডজন ইউনিট টানা ২৪ ঘণ্টারও বেশি সময় আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়ে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনলেও সোমবার পর্যন্ত ভবনের বিভিন্ন অংশ থেকে ধোঁয়া বের হতে দেখা গেছে।
বর্তমানে পুরো ভবনটি একটি কঙ্কালসার ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে। উদ্ধারকারী কর্মকর্তাদের মতে, আগুনের তীব্রতায় ভবনের পরিকাঠামো বা ‘Structural Integrity’ মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, যা যেকোনো সময় ধসে পড়তে পারে।
মোবাইল লোকেশন দিচ্ছে অশুভ সংকেত
নিখোঁজ ৫৮ জনের সন্ধানে উদ্ধারকারীরা আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহারের চেষ্টা করছেন। জানা গেছে, নিখোঁজদের মধ্যে অন্তত ২৬ জনের ‘Mobile Location’ থেকে নিশ্চিত হওয়া গেছে যে, আগুন লাগার সময় তাঁরা ভবনের ভেতরেই অবস্থান করছিলেন। স্বজনদের আহাজারিতে এখন ভারি হয়ে আছে গুল প্লাজার চারপাশ।
এক প্রত্যক্ষদর্শী দোকান মালিক অশ্রুসিক্ত চোখে জানান, “আমার চোখের সামনে সাধের দোকানগুলো ছাই হয়ে গেল। আগুনের লেলিহান শিখা যখন গ্রাস করছিল, তখন অনেক মানুষ ভেতরে আটকা পড়েছিলেন। এখন তাঁদের কোনো খোঁজ পাচ্ছি না।” স্থানীয়রা জানিয়েছেন, শুরুতে দোকান মালিকরা ‘Fire Extinguisher’ দিয়ে আগুন নেভানোর চেষ্টা করলেও আগুনের ভয়াবহতার কাছে তা ছিল অত্যন্ত সামান্য।
উদ্ধার অভিযান ও সম্ভাব্য চ্যালেঞ্জ
বর্তমানে বিশাল ক্রেন ব্যবহার করে ধ্বংসস্তূপ সরানোর কাজ শুরু হয়েছে। তবে উদ্ধারকারীরা জানিয়েছেন, ভবনের উত্তপ্ত অংশগুলো পুরোপুরি ঠাণ্ডা না হওয়া পর্যন্ত ভেতরে প্রবেশ করা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। ধ্বংসস্তূপ এবং ঘন ধোঁয়ার কারণে তল্লাশি অভিযান বা ‘Search and Rescue Operation’ বারবার বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।
প্রেসিডেন্টের শোক ও ‘Safety Audit’-এর নির্দেশ
এই ভয়াবহ ট্র্যাজেডিতে গভীর শোক প্রকাশ করেছেন পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট আসিফ আলি জারদারি। তিনি নিহতদের পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানানোর পাশাপাশি সিন্ধু প্রাদেশিক সরকারকে একটি জরুরি নির্দেশ দিয়েছেন। করাচি শহরজুড়ে থাকা প্রতিটি বাণিজ্যিক ও আবাসিক ভবনের অগ্নি নিরাপত্তা ব্যবস্থা বা ‘Safety Standards’ নতুন করে মূল্যায়ন বা ‘Safety Audit’ করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। ভবিষ্যতে এমন প্রাণহানি এড়াতে কঠোর আইন প্রয়োগের কথাও বলেছেন তিনি।
করাচির এই অগ্নিকাণ্ড আবারও পাকিস্তানের ঘিঞ্জি বাণিজ্যিক এলাকাগুলোর নিরাপত্তা ঘাটতিকে সামনে নিয়ে এসেছে। ১২০০ দোকানের এই বিশাল ব্যবসায়িক ক্ষতি কাটিয়ে ওঠা যেমন কঠিন, তেমনি নিখোঁজ ৫৮ জনের পরিবারের অপেক্ষা এখন এক চরম অনিশ্চয়তার পথে।