জেরুজালেম ও আন্তর্জাতিক ডেস্ক: বিশ্ববিবেকের তোয়াক্কা না করে পূর্ব জেরুজালেমে জাতিসংঘের ফিলিস্তিনি শরণার্থী সংস্থার (UNRWA) প্রধান কার্যালয়টি বুলডোজার দিয়ে গুঁড়িয়ে দিয়েছে ইসরাইল। মঙ্গলবার (২০ জানুয়ারি) ভোরে ইসরাইলি নিরাপত্তা বাহিনী এই ধ্বংসযজ্ঞ চালায়। এই পদক্ষেপকে কেবল একটি স্থাপনা ধ্বংস নয়, বরং আন্তর্জাতিক আইন এবং জাতিসংঘের ‘Diplomatic Immunity’ বা কূটনৈতিক সুরক্ষা কবচের ওপর সরাসরি আঘাত হিসেবে দেখছেন বিশ্লেষকরা।
গাজা, পশ্চিম তীরসহ মধ্যপ্রাচ্যের বিস্তীর্ণ অঞ্চলে ফিলিস্তিনি শরণার্থীদের শিক্ষা, জরুরি স্বাস্থ্যসেবা এবং মানবিক ত্রাণ সহায়তার প্রধান স্তম্ভ হিসেবে কাজ করে ইউএনআরডব্লিউএ। সংস্থাটির এই আঞ্চলিক দপ্তরে হামলার মাধ্যমে ইসরাইল তাদের দীর্ঘদিনের হুমকি বাস্তবায়ন করল।
কাকডাকা ভোরে বুলডোজারের ধ্বংসযজ্ঞ
প্রত্যক্ষদর্শী ও ইউএনআরডব্লিউএ সূত্রে জানা গেছে, মঙ্গলবার স্থানীয় সময় সকাল ৭টার দিকে ইসরাইলি নিরাপত্তা বাহিনীর একটি বিশাল দল ভারী সরঞ্জামসহ জেরুজালেমের ওই ‘Compound’-এ প্রবেশ করে। সেখানে দায়িত্বরত নিরাপত্তাকর্মীদের জোরপূর্বক বের করে দিয়ে বুলডোজার দিয়ে একের পর এক ভবন গুঁড়িয়ে দেওয়া শুরু হয়। নিমিষেই ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয় শরণার্থীদের সেবায় নিয়োজিত একাধিক প্রশাসনিক ও সেবামূলক স্থাপনা।
ইউএনআরডব্লিউএ-এর মুখপাত্র জোনাথন ফাওলার এই ঘটনার তীব্র নিন্দা জানিয়ে বলেন, “এটি জাতিসংঘের ইতিহাসে একটি কালো দিন। ইসরাইলি বাহিনী কোনো প্রকার পূর্ব নোটিশ ছাড়াই আন্তর্জাতিক আইনের গুরুতর লঙ্ঘন ঘটিয়েছে। এটি কেবল একটি ভবনের ওপর হামলা নয়, এটি জাতিসংঘের ‘Special Rights’ এবং বৈশ্বিক কূটনৈতিক রীতিনীতির ওপর এক নজিরবিহীন আক্রমণ।”
‘অন্যান্য আন্তর্জাতিক সংস্থার জন্যও এটি সতর্কবার্তা’
জাতিসংঘের পক্ষ থেকে এই ঘটনাকে একটি অশনিসংকেত হিসেবে অভিহিত করা হয়েছে। জোনাথন ফাওলার হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, “আজ যা ইউএনআরডব্লিউএ-এর সঙ্গে ঘটছে, আগামীকাল বিশ্বের যেকোনো প্রান্তের আন্তর্জাতিক সংস্থা বা ‘Diplomatic Mission’-এর ওপরও একই ধরনের আক্রমণ হতে পারে।”
ইসরাইল দীর্ঘদিন ধরেই ইউএনআরডব্লিউএ-এর বিরুদ্ধে ‘Hamas’-কে মদদ দেওয়ার অভিযোগ তুলে আসছে। তেল আবিবের দাবি, ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর ইসরাইলে হামাসের পরিচালিত অভিযানে সংস্থাটির কিছু কর্মী সরাসরি জড়িত ছিল। এই অভিযোগের প্রেক্ষাপটে ২০২৪ সালের অক্টোবরে একটি বিতর্কিত আইন পাসের মাধ্যমে ইউএনআরডব্লিউএ-এর কার্যক্রম নিষিদ্ধ ঘোষণা করে ইসরাইল। যদিও ফ্রান্সের সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী ক্যাথরিন কোলোনার নেতৃত্বে পরিচালিত তদন্তে কিছু ‘Neutrality Issues’ বা নিরপেক্ষতা সংক্রান্ত ত্রুটি পাওয়া গেলেও, ইসরাইলের মূল অভিযোগের পক্ষে কোনো অকাট্য প্রমাণ মেলেনি।
বেন গভিরের উল্লাস ও ইসরাইলের আইনি অবস্থান
এই ধ্বংসযজ্ঞের সময় ইসরাইলের জাতীয় নিরাপত্তামন্ত্রী ইতামার বেন গভির সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি ভিডিও পোস্ট করে বিষয়টিকে উদযাপন করেন। তিনি বলেন, “এটি একটি ঐতিহাসিক দিন। জেরুজালেমে আমাদের শাসনের জন্য এটি একটি উৎসবের মুহূর্ত। বছরের পর বছর ধরে এখানে সন্ত্রাসবাদের সমর্থকরা আস্তানা গেড়ে ছিল, আজ তাদের চিহ্ন মুছে দেওয়া হচ্ছে।” তিনি স্পষ্ট ভাষায় হুঁশিয়ারি দেন যে, সন্ত্রাসবাদের সমর্থকদের পরিণতি এমনই হবে।
অন্যদিকে, ইসরাইলের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, এই পদক্ষেপ কোনো আকস্মিক সিদ্ধান্ত নয়, বরং ইসরাইলি পার্লামেন্টে পাস হওয়া আইনের বাস্তবায়ন। তাদের দাবি, জেরুজালেমের এই নির্দিষ্ট জমিটি ইসরাইল রাষ্ট্রের মালিকানাধীন (State Owned), এবং অবৈধভাবে সেখানে সংস্থাটি কার্যক্রম পরিচালনা করছিল।
চরম সংকটে ফিলিস্তিনি শরণার্থীদের ভবিষ্যৎ
পূর্ব জেরুজালেমে এই কার্যালয়টি ধ্বংস করার ফলে ফিলিস্তিনি শরণার্থীদের ত্রাণ বিতরণ ও প্রশাসনিক কার্যক্রমে বড় ধরনের ধস নামার আশঙ্কা করা হচ্ছে। বিশেষ করে গাজায় চলমান মানবিক সংকটের মধ্যে ইউএনআরডব্লিউএ-এর ওপর ইসরাইলের এই মরণ কামড় ফিলিস্তিনি সাধারণ মানুষের জীবনকে আরও দুর্বিষহ করে তুলবে। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলো মনে করছে, ইসরাইলের এই আগ্রাসী মনোভাব বৈশ্বিক ‘Multilateralism’ বা বহুপাক্ষিক সম্পর্কের ভিত্তিকে চরম হুমকির মুখে ঠেলে দিচ্ছে।