সূচনা: বিতর্কের জন্ম
২০২৬ সালের টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড (বিসিবি), আইসিসি ও ক্রীড়া উপদেষ্টার মধ্যে প্রায় তিন সপ্তাহ ধরে এক নাটকীয় পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে। এর সূত্রপাত হয় ৩ জানুয়ারি, যখন ভারতীয় ক্রিকেট নিয়ন্ত্রণ বোর্ডের (বিসিসিআই) নির্দেশে কলকাতা নাইট রাইডার্স (কেকেআর) দল থেকে বাংলাদেশের তারকা পেসার মোস্তাফিজুর রহমানকে বাদ দেওয়া হয়।
আসিফ নজরুলের ভারত বর্জনের ঘোষণা
মোস্তাফিজকে আইপিএল দল থেকে বাদ দেওয়ার সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া জানান ক্রীড়া উপদেষ্টা আসিফ নজরুল। তিনি বাংলাদেশে ইন্ডিয়ান প্রিমিয়ার লিগের (আইপিএল) সম্প্রচার বন্ধের অনুরোধ করেন। এর পরের দিন, অর্থাৎ ৪ জানুয়ারি, টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের জন্য বাংলাদেশ দল ঘোষণার পরই তিনি স্পষ্ট জানিয়ে দেন যে বাংলাদেশ ভারতে বিশ্বকাপ খেলবে না। একই সঙ্গে বিসিবিকে ম্যাচগুলো অন্য কোনো দেশে সরিয়ে নেওয়ার জন্য আইসিসিকে অনুরোধ করতে বলেন।
সম্প্রচার বন্ধের সরকারি নির্দেশ
ক্রীড়া উপদেষ্টার বক্তব্যের পরপরই ৫ জানুয়ারি তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয় বাংলাদেশে আইপিএল সম্প্রচার বন্ধ রাখার নির্দেশ দেয়। এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট সম্প্রচারমাধ্যমগুলোকে চিঠিও পাঠানো হয়।
আইসিসির অনড় অবস্থান ও বিসিবির বারবার অনুরোধ
৬ জানুয়ারি আইসিসির সঙ্গে বিসিবির ভার্চ্যুয়াল বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। ক্রিকইনফোর খবরে জানা যায়, বৈঠকে আইসিসি বিসিবিকে জানিয়ে দেয়, বাংলাদেশের ম্যাচগুলো ভারত থেকে সরানো সম্ভব নয়।
এরপর ৭ জানুয়ারি বিসিবি জানায়, আইসিসি কোনো আলটিমেটাম দেয়নি। তবে ক্রীড়া উপদেষ্টা তার অবস্থানে অনড় থেকে স্পষ্ট করেন যে দেশের মর্যাদার প্রশ্নে আপস করে বাংলাদেশ ভারতে খেলতে যাবে না।
এই অবস্থানের ধারাবাহিকতায় ৮ জানুয়ারি বাংলাদেশের ম্যাচগুলো ভারত থেকে সরিয়ে শ্রীলঙ্কায় নেওয়ার অনুরোধ জানিয়ে আইসিসিকে দ্বিতীয় দফায় ইমেইল করে বিসিবি।
নিরাপত্তা ঝুঁকি ও পাকিস্তানের সমর্থন
১২ জানুয়ারি ক্রীড়া উপদেষ্টা জানান, আইসিসির নিরাপত্তা দল ভারতে মোস্তাফিজসহ বাংলাদেশ দলের জন্য তিনটি বড় ঝুঁকির কথা বলেছে। তবুও উপদেষ্টা ভারতে না যাওয়ার অনড় অবস্থানের কথা পুনর্ব্যক্ত করেন।
পরে ১৩ জানুয়ারি বিসিবি ও আইসিসির মধ্যে আরও একটি ভিডিও কনফারেন্স অনুষ্ঠিত হয়। সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বিসিবি জানায়, আবারও তারা বাংলাদেশের ম্যাচ ভারতের বাইরে অন্য কোনো দেশে আয়োজনের জন্য আইসিসিকে অনুরোধ করেছে। ১৭ জানুয়ারি ঢাকায় আইসিসির প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠকে বিসিবি আবারও ম্যাচ শ্রীলঙ্কায় নেওয়ার প্রস্তাব দেয়। গণমাধ্যম সূত্রে জানা যায়, 'বি' গ্রুপে থাকা আয়ারল্যান্ডের সঙ্গে গ্রুপ অদলবদলের অনুরোধও করেছে বাংলাদেশ।
অন্যদিকে, ১৮ জানুয়ারি পাকিস্তানের গণমাধ্যমগুলো জানায় যে বাংলাদেশের দাবি পূরণ না হলে পাকিস্তান ক্রিকেট বোর্ড (পিসিবি) বিশ্বকাপে খেলার সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা করবে। ২০ জানুয়ারি ক্রীড়া উপদেষ্টা আবার সাফ জানিয়ে দেন, কোনো ‘অযৌক্তিক চাপে’ পড়ে বাংলাদেশ ভারতে খেলতে যাবে না এবং বাংলাদেশের পক্ষ নিয়ে পিসিবি আইসিসিকে চিঠি দিয়েছে।
চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত ও শেষ মুহূর্তের আলটিমেটাম
সব নাটকীয়তার পর, ২১ জানুয়ারি আইসিসি বোর্ড সভায় টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের সূচি অপরিবর্তিত রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। একই সঙ্গে বিসিবিকে ভারতে যাওয়ার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত জানাতে এক দিন সময় দেওয়া হয়। এমন অবস্থায় বাংলাদেশের সামনে এখন একটাই পথ—হয় ভারতকে মেনে নিতে হবে, নয়তো বিশ্বকাপ থেকে নিজেদের প্রত্যাহার করে নিতে হবে।