• বিনোদন
  • মাইকেল মধুসূদন দত্তের কালজয়ী সৃষ্টি ‘মেঘনাদবধ কাব্য’: যেখানে রাম-লক্ষণ আসলে ঔপনিবেশিক শক্তি, রাবণ-মেঘনাদ দেশপ্রেমিক!

মাইকেল মধুসূদন দত্তের কালজয়ী সৃষ্টি ‘মেঘনাদবধ কাব্য’: যেখানে রাম-লক্ষণ আসলে ঔপনিবেশিক শক্তি, রাবণ-মেঘনাদ দেশপ্রেমিক!

বিনোদন ১ মিনিট পড়া
মাইকেল মধুসূদন দত্তের কালজয়ী সৃষ্টি ‘মেঘনাদবধ কাব্য’: যেখানে রাম-লক্ষণ আসলে ঔপনিবেশিক শক্তি, রাবণ-মেঘনাদ দেশপ্রেমিক!

১৮৫৭ সালের সিপাহী বিদ্রোহের অনুপ্রেরণায় রচিত বাংলা সাহিত্যের প্রথম সার্থক মহাকাব্য; অমিত্রাক্ষর ছন্দ-এর ব্যবহার এবং আধুনিক ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে এর প্রাসঙ্গিকতা।

বাংলা রেনেসাঁ (Renaissance)-এর সার্থক প্রতিনিধি মাইকেল মধুসূদন দত্ত ১৮২৪ সালের ২৫ জানুয়ারি যশোর জেলার কেশবপুর উপজেলার সাগরদাঁড়ি গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। কাব্যগ্রন্থ, প্রহসন, নাটক, পত্রকাব্য, মহাকাব্য, সনেট (Sonnet) প্রভৃতি শিল্পাঙ্গিক নিয়ে কাজ করেছেন এই আধুনিক কবি। তাঁর ঐতিহাসিক সৃষ্টি ‘মেঘনাদবধ কাব্য’ (১৮৬১) বাংলা সাহিত্যের প্রথম সার্থক মহাকাব্য হিসেবে চিরস্মরণীয়।

আধুনিকতার প্রথম মাইলফলক ও অমিত্রাক্ষর ছন্দ-এর ব্যবহার

বাংলা সাহিত্যের আধুনিক যুগের প্রথম মাইলফলক (Milestone) ধরা হয় ‘মেঘনাদবধ কাব্য’-কে। মূলত ১৮৫৭ সালের সিপাহী বিপ্লবে প্রভাবিত হয়ে মাইকেল এই কাব্যটি রচনা করেন। এটি একটি রূপক বা সাংকেতিক করুণরস প্রদানকারী অমিত্রাক্ষর ছন্দে রচিত ইতিহাস আশ্রয়ী মহাকাব্য। কাব্যের কাহিনীতে রামায়ণের মাত্র ৩ দিন ২ রাতের ঘটনা থাকলেও এর অন্তর্নিহিত তাৎপর্য একেবারেই ভিন্ন।

রূপক ও সাংকেতিক বার্তা: রাম-লক্ষ্মণ ব্রিটিশদের প্রতীক

মাইকেল মধুসূদন দত্ত এই কাব্যে ঔপনিবেশিক (Colonial) শক্তির বিরুদ্ধে এক গভীর রাজনৈতিক বার্তা প্রস্ফুটিত করেছেন। এর রূপক ব্যাখ্যায়:

রাম ও লক্ষণ ঔপনিবেশিক শক্তি অর্থাৎ ব্রিটিশদের প্রতীক, যারা দখলদার পরাশক্তি।

অপরদিকে, রাবণ ও মেঘনাদ এখানে দেশপ্রেমিক, যারা দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষার জন্য লড়াই করছেন।

বাঙালি জাতি এখানে নিপীড়ন ও বঞ্চিত জনগণের প্রতীক।

মাইকেল মধুসূদন দত্ত এখানে জন মিল্টনের ‘প্যারাডাইস লস্ট’, দান্তের ‘ডিভাইন কমেডি’ এবং হোমারের ‘ইলিয়ড ও ওডিসি’ মহাকাব্যকে অনুসরণ ও অনুকরণ করেছেন।

বিভীষণ: বিশ্বাসঘাতকতা ও কাপুরুষতার উদাহরণ

কাব্যের প্রথম স্বর্গে দেখা যায় রাম ও লক্ষ্মণের অতর্কিত আক্রমণে রাবণের এক পুত্র বীরবাহু নিহত হন। পিতার এই বিপদে দেশ রক্ষার্থে পুত্র মেঘনাদ (অপর নাম ইন্দ্রজিৎ ও অরিন্দম) দায়িত্ব গ্রহণ করেন। মেঘের আড়াল থেকে যুদ্ধ পরিচালনা করত বলেই তাঁর নাম মেঘনাদ।

অন্যদিকে, মুখোমুখি যুদ্ধে তাঁকে পরাজিত করা অসম্ভব জেনে রাম ও লক্ষণ মিলে রাবণের ছোট ভাই বিভীষণ-এর সঙ্গে গোপন চুক্তি সম্পাদন করে। বিভীষণকে রাবণের পরবর্তী রাজা হওয়ার লোভ দেখিয়ে মেঘনাদকে বধ করতে সাহায্যের প্রার্থনা করে তারা। নিরস্ত্র মেঘনাদ যুদ্ধের পূর্বে নিকুম্ভিলা যজ্ঞাগারে ইষ্ট দেবীকে তুষ্ট করতে যখন পূজারত, ঠিক সেই সময় বিভীষণ-এর সহায়তায় লক্ষণ পেছন থেকে মেঘনাদকে হত্যা করে। এটি ছিল চরম কাপুরুষতার উদাহরণ।

এরপর রাবণ ক্রুদ্ধ হয়ে মুখোমুখি যুদ্ধে লক্ষণকে হত্যা করলেও, দেবতাদের চক্রান্তে হিমালয়ের সঞ্জীবনী বুটির গুনে লক্ষণ প্রাণ ফিরে পান। কিন্তু দেবতারা রাবণ বা মেঘনাদকে কোনো সাহায্য করেনি। মাইকেল মধুসূদন দত্ত এখানে এই দেবতাদের পৃথিবীর পরাশক্তির (Superpower) প্রতীক বুঝিয়েছেন, যারা বাইরে সাম্য ও ন্যায়ের কথা বললেও ভেতরে তারা নিজেদের এজেন্ডা (Agenda) বাস্তবায়ন করে।

দেশপ্রেম ও সার্বভৌমত্বের বার্তা আজও প্রাসঙ্গিক

পিতা রাবণ সন্তানের লাশ অশ্রুসিক্ত চোখে চিতায় পুড়িয়ে দেন। মেঘনাদের স্ত্রী প্রমীলা দেবীও সহমরণ গ্রহণ করেন। মূলত, দেশপ্রেমিক ভারতবাসী তথা বাঙালি যুগে যুগে প্রবল সাহসিকতার পরিচয় দিলেও শুধু পরাশক্তির চক্রান্তে তা বারবার ব্যাহত হয়েছে। এই বিষয়টিই ‘মেঘনাদবধ কাব্য’-এ প্রস্ফুটিত করেছেন মাইকেল মধুসূদন দত্ত।

এই কাব্যে থাকা বার্তার প্রাসঙ্গিকতা যে আজও শেষ হয়নি, তার বড় উদাহরণ বাংলাদেশের বাস্তবতা। বাংলাদেশ দাঁড়িয়ে আছে এক জটিল ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতিতে (Geopolitical Situation)। দেশের ওপর আছে আঞ্চলিক পরাশক্তির প্রভাব ও বৈশ্বিক প্রভাব। যারা স্বাধীন ও সার্বভৌম দেশ হিসেবে বাংলাদেশের স্বকীয়তা-কে নিজেদের ছকের বাইরে রাখতে চায় না। তবে বাংলাদেশের জাতীয়তাবাদ ও মুক্তির সংগ্রামগুলোতে বারবার বুঝিয়ে দিয়েছে এই সাহসী জাতি দেশের সার্বভৌমত্বের প্রশ্নে ঐক্যবদ্ধ।

Tags: geopolitics bangladesh sovereignty michael madhusudan dutt meghnad badh kabya bangla literature amritakshar chhanda colonial interpretation sipahi biplob