বাংলাদেশের নৃত্যশিল্পের ইতিহাসে এক অনন্য নাম ‘নৃত্যাঞ্চল’। শুদ্ধ ধারা ও সৃজনশীল নৃত্যচর্চাকে বেগবান করতে দীর্ঘ ২৫ বছর ধরে কাজ করে যাচ্ছে এই প্রতিষ্ঠানটি। সৃজনশীলতার এই দীর্ঘ যাত্রাকে স্মরণীয় করে রাখতে শনিবার (৩১ জানুয়ারি) রাজধানীর মানিক মিয়া এভিনিউ সংলগ্ন রাজধানী উচ্চ বিদ্যালয় প্রাঙ্গণে আয়োজিত হলো দিনব্যাপী ‘রজতজয়ন্তী উৎসব’। শীতের আমেজে ‘পৌষ মেলা’ ও এক বিশেষ আর্কাইভাল প্রদর্শনীর মাধ্যমে এই বিশেষ দিনটি উদযাপন করা হয়।
বর্ণাঢ্য র্যালি ও উদ্বোধনী আনুষ্ঠানিকতা
শনিবার বিকেলের স্নিগ্ধতায় এক রঙিন ও উৎসবমুখর র্যালির মাধ্যমে অনুষ্ঠানের শুভ সূচনা ঘটে। বাদ্যযন্ত্রের তালের সঙ্গে নৃত্যাঞ্চলের শিল্পী ও শিক্ষার্থীদের পদচারণায় মুখরিত হয়ে ওঠে রাজপথ। র্যালি শেষে প্রদর্শনীর আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন নৃত্যাঞ্চলের দুই প্রতিষ্ঠাতা পরিচালক এবং একুশে পদকজয়ী প্রখ্যাত নৃত্যব্যক্তিত্ব শিবলী মহম্মদ ও শামীম আরা নীপা। দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে দেশের নাচের অঙ্গনকে আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করতে এই দুই কিংবদন্তির অবদান অনস্বীকার্য।
স্মৃতির আর্কাইভে ২৫ বছরের ইতিহাস
উৎসবের অন্যতম প্রধান আকর্ষণ ছিল ২০০১ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত নৃত্যাঞ্চলের বিবর্তনের এক সমৃদ্ধ প্রদর্শনী। এই ‘Archival Exhibition’-এ স্থান পেয়েছে প্রতিষ্ঠানটির অর্জন করা বিভিন্ন রাষ্ট্রীয় ও জাতীয় পদক। এছাড়াও বিগত ২৫ বছরে বিভিন্ন জাতীয় দৈনিকে প্রকাশিত সংবাদপত্রের প্রতিবেদন (Press Clippings), ম্যাগাজিন কভার এবং আকর্ষণীয় সব ড্যান্স প্রোডাকশনের (Dance Production) পোস্টার ও টিকিট দর্শকদের মুগ্ধ করে। প্রদর্শনীর গ্যালারিগুলোতে আরও ছিল নৃত্যাঞ্চল প্রকাশিত বিশেষ নিউজ বুলেটিন, ক্যালেন্ডার, ঈদ কার্ড এবং দুষ্প্রাপ্য সব সিডি, ক্যাসেট ও ভিডিওচিত্র। এই প্রদর্শনীটি কেবল একটি আয়োজন নয়, বরং দেশের নৃত্যশিল্পের বিবর্তনের একটি প্রামাণ্য দলিল হিসেবে প্রতীয়মান হয়েছে।
তারার মেলা ও সাংস্কৃতিক আড্ডা
রজতজয়ন্তীর এই আনন্দঘন মাহেন্দ্রক্ষণে শুভেচ্ছা জানাতে উপস্থিত হয়েছিলেন দেশের সাংস্কৃতিক অঙ্গনের উজ্জ্বল নক্ষত্ররা। আমন্ত্রিত অতিথিদের মধ্যে ছিলেন প্রখ্যাত নৃত্যশিল্পী ও মডেল সাদিয়া ইসলাম মৌ, বিশিষ্ট নৃত্যগুরু কবিরুল ইসলাম রতন, নৃত্যশিল্পী তান্না এবং জনপ্রিয় অভিনেত্রী তাহমিনা সুলতানা মৌ। গুণী এই ব্যক্তিত্বদের উপস্থিতিতে অনুষ্ঠান প্রাঙ্গণ এক নক্ষত্রখচিত মিলনমেলায় পরিণত হয়। তারা নৃত্যাঞ্চলের দীর্ঘ পথচলার ভূয়সী প্রশংসা করেন এবং আগামী দিনে এর আরও সমৃদ্ধি কামনা করেন।
নাচের মুদ্রায় পৌষের বিকেল
উদ্বোধনী আনুষ্ঠানিকতা শেষে মঞ্চে শুরু হয় নৃত্যাঞ্চলের শিক্ষার্থী ও পেশাদার শিল্পীদের মনোজ্ঞ নৃত্য পরিবেশনা। শাস্ত্রীয় ও আধুনিক নাচের যুগলবন্দী দর্শকদের মোহাচ্ছন্ন করে রাখে। শীতের বিকেলে খোলা আকাশের নিচে পৌষ মেলার পিঠা-পুলির ঘ্রাণ আর নূপুরের নিক্বণ—সব মিলিয়ে এক অপার্থিব পরিবেশ তৈরি হয়। দর্শকদের উপচে পড়া ভিড় প্রমাণ করে দিয়েছে যে, শুদ্ধ সংস্কৃতির চর্চা আজও সাধারণ মানুষের হৃদয়ে কতটা গভীর আসন দখল করে আছে।
শিল্পের দায়বদ্ধতা ও ভবিষ্যৎ লক্ষ্য
প্রতিষ্ঠাতা শিবলী মহম্মদ ও শামীম আরা নীপা তাদের বক্তব্যে জানান, নৃত্যাঞ্চল কেবল একটি নাচের স্কুল নয়, এটি একটি আদর্শ ও সংস্কৃতির আধার। বিগত ২৫ বছরের এই ‘Legacy’ বা উত্তরসূরিদের জন্য রাখা এই সঞ্চয় আগামী দিনে বাংলাদেশের নৃত্যশিল্পকে বিশ্বমঞ্চে আরও শক্তিশালী অবস্থানে নিয়ে যাবে বলে তারা দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করেন।