১০ বছর আগে যখন বিবিসির পর্দায় জনাথন পাইন নামক এক হোটেল ম্যানেজারের হাত ধরে আন্তর্জাতিক অপরাধ জগতের অন্ধকার অন্দরমহলে প্রবেশ করেছিল দর্শক, তখন সেটি ছিল এক বৈশ্বিক উন্মাদনা। বিলাসবহুল লোকেশন, স্টাইলিশ মেকিং আর পরিমিত আভিজাত্য সিরিজটিকে তৎকালীন অন্য সব Spy Thriller থেকে আলাদা উচ্চতায় নিয়ে গিয়েছিল। দীর্ঘ এক দশকের অপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে সম্প্রতি মুক্তি পেয়েছে ‘দ্য নাইট ম্যানেজার ২’। ১ জানুয়ারি থেকে ১ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ছয় পর্বে মুক্তি পাওয়া এই দ্বিতীয় মৌসুমটি নিয়ে দর্শকদের মনে যেমন ছিল প্রবল কৌতূহল, তেমনি ছিল এক ধরণের আশঙ্কা—প্রথম কিস্তির সেই ধ্রুপদী রোমাঞ্চ কি আবারও ফিরিয়ে আনতে পারবেন নির্মাতারা? ছয় পর্বের স্ট্রিমিং শেষে নির্দ্বিধায় বলা যায়, জনাথন পাইনের ফেরাটা কেবল মন্দ নয়, বরং বেশ জোরালো।
জনাথন পাইনের নতুন জীবন ও সিসিটিভি নজরদারি
প্রথম মৌসুমে আমরা দেখেছিলাম আন্তর্জাতিক অস্ত্র ব্যবসায়ীদের ধরতে প্রাক্তন সেনা কর্মকর্তা জনাথন পাইন কীভাবে MI6-এর হয়ে জীবনের ঝুঁকি নিয়েছিলেন। দ্বিতীয় মৌসুমে গল্পের প্রেক্ষাপট খানিকটা বদলে গেছে। পাইন এখনো গোপন সংস্থার সঙ্গেই যুক্ত আছেন, তবে তিনি আর সরাসরি মাঠে (On-field) নামেন না। ব্যক্তিগত জীবনের ট্র্যাজেডি আর মানসিক আঘাত কাটিয়ে তিনি এখন লন্ডনের এক অভিজাত হোটেলের CCTV নজরদারি ইউনিটের প্রধান। স্ক্রিনে চোখ রেখে সম্ভাব্য জঙ্গি তৎপরতা বা অপরাধের ইঙ্গিত খুঁজে বের করাই তাঁর কাজ। কিন্তু রুটিন মাফিক এই নজরদারি চালাতে গিয়েই হঠাৎ তাঁর চোখে পড়ে এক পুরোনো শত্রু। এখান থেকেই শুরু হয় নতুন সংঘাত।
কলম্বিয়া সংযোগ ও নতুন ষড়যন্ত্র
এবারের মিশনের কেন্দ্রবিন্দু লাতিন আমেরিকার দেশ কলম্বিয়া। ব্রিটিশ গোয়েন্দাদের অগোচরে সেখানে দেদারসে ঢুকছে আধুনিক মারণাস্ত্র, যার নেপথ্য উদ্দেশ্য হলো দেশটির বর্তমান সরকারকে উৎখাত করা। এই ষড়যন্ত্রের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন টেডি দোস সান্তোস, যাঁর চরিত্রে অভিনয় করেছেন দিয়েগো কালভা। নিজের দেশে বিশাল এক গেরিলা বাহিনী গড়ে তোলার পেছনে তাঁর এই অস্ত্র আমদানির পরিকল্পনা। এই ধ্বংসাত্মক খেলা রুখতে জনাথন পাইন কীভাবে কলম্বিয়ার গোলকধাঁধায় প্রবেশ করেন, তা নিয়েই এগিয়েছে এবারের চিত্রনাট্য।
হিডলস্টন ও লরির সেই চিরচেনা জাদুকরী রসায়ন
সিরিজের প্রাণভোমরা টম হিডলস্টন জনাথন পাইন চরিত্রে আবারও নিজেকে ছাড়িয়ে গেছেন। তাঁর চাহনি আর অভিব্যক্তিতে ফুটে ওঠা ক্লান্তি গল্পের গভীরতাকে কয়েক গুণ বাড়িয়ে দেয়। তবে এবারের মৌসুমের সবচেয়ে বড় চমক ছিল হিউ লরির প্রত্যাবর্তন। রোপার চরিত্রে তাঁর ফিরে আসাটি ছিল গল্পের প্রধান Secret Element যা আগে গোপন রাখা হয়েছিল। স্টেক লাঞ্চের টেবিলে হিডলস্টন এবং লরির প্রায় ১০ মিনিটের একটি দৃশ্য দর্শকদের আবারও সেই প্রথম মৌসুমের নস্টালজিয়ায় ফিরিয়ে নিয়ে যায়। দুই তুখোড় অভিনেতার এই মনস্তাত্ত্বিক খেলা বা Psychological Game ছিল দেখার মতো।
পরিণত মেকিং বনাম ধীরগতি
পরিচালক জর্জি ব্যাংকস-ডেভিস এবারের গল্প বলার ঢঙে কিছুটা পরিবর্তন এনেছেন। প্রথম কিস্তিতে অ্যাকশন আর গ্ল্যামারের যে আধিক্য ছিল, এবার সেখানে জায়গা করে নিয়েছে মানুষের ভেতরের লড়াই। গল্পের শুরু থেকেই এক ধরণের ধোঁয়াশা বজায় রাখা হয়েছে—কে ভালো আর কে মন্দ, তা বোঝা সাধারণ দর্শকদের জন্য কঠিন হয়ে দাঁড়ায়। এই ধীরগতি ও মনস্তাত্ত্বিক গভীরতা সিরিজটিকে আরও পরিণত করে তুললেও, যারা দ্রুতগতির Spy Thriller পছন্দ করেন, তাদের কাছে এটি কিছুটা মন্থর মনে হতে পারে। তবে গল্পের প্রয়োজনে চরিত্রগুলোর মানসিক ভঙ্গুরতা ফুটিয়ে তুলতে এই গতিমন্থরতা ছিল অপরিহার্য।
ফ্র্যাঞ্চাইজি গড়ার বাণিজ্যিক লক্ষ্য
এবারের মৌসুমে বিবিসির সঙ্গে যুক্ত হয়েছে Tech Giant অ্যামাজন এমজিএম স্টুডিওজ। উচ্চবিত্তের লাইফস্টাইল আর আন্তর্জাতিক রাজনীতির সমীকরণে বাজেট যে বহুগুণ বাড়ানো হয়েছে, তা প্রতিটি ফ্রেমেই স্পষ্ট। বোঝাই যাচ্ছে, ‘নাইট ম্যানেজার’কে একটি নতুন এবং দীর্ঘমেয়াদি Franchise-এ রূপান্তরের পথে হাঁটছে প্রযোজনা সংস্থাটি। ইতিমধ্যে তৃতীয় মৌসুমের Pre-production শুরু হওয়ার খবরও পাওয়া গেছে। সব মিলিয়ে, সাম্প্রতিক সময়ের দুর্বল অনেক গোয়েন্দা কাহিনীর ভিড়ে ‘দ্য নাইট ম্যানেজার ২’ তার নিজস্ব স্বকীয়তা আর গুণগত মান বজায় রেখে দর্শকদের মনের খোরাক জোগাতে সক্ষম হয়েছে।