পবিত্র রমজানের সংযম আর ভ্রাতৃত্বের আবহে রাজধানীর বুকে অনুষ্ঠিত হলো এক তাৎপর্যপূর্ণ সুধী সমাবেশ। শুক্রবার (৬ মার্চ) রাজধানীর ‘শহীদ আবু সাঈদ ইন্টারন্যাশনাল কনভেনশন সেন্টার’-এ বিভিন্ন রাজনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক অঙ্গনের বিশিষ্ট ব্যক্তিদের সম্মানে এক বর্ণাঢ্য ইফতার মাহফিলের আয়োজন করে বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবির। আধ্যাত্মিক আলোচনার পাশাপাশি অনুষ্ঠানটি রূপ নেয় দেশের সমসাময়িক রাজনৈতিক সংকট ও আগামী দিনের চ্যালেঞ্জ নিয়ে এক জোরালো আলোচনার মঞ্চে।
বিশিষ্টজনদের মিলনমেলা ও ভ্রাতৃত্বের মেলবন্ধন
ছাত্রশিবিরের কেন্দ্রীয় সভাপতি নূরুল ইসলামের সভাপতিত্বে এবং সেক্রেটারি জেনারেল সিবগাতুল্লাহ সিবগারের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ও জাতীয় সংসদে বিরোধী দলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান।
অনুষ্ঠানে জাতীয় রাজনীতির শীর্ষ ব্যক্তিত্বদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টির (LDP) চেয়ারম্যান কর্নেল (অব.) অলি আহমেদ, জাতীয় গণতান্ত্রিক পার্টির সহ-সভাপতি রাশেদ প্রধান, খেলাফত মজলিসের নায়েবে আমির আহমদ আলী কাসেমী এবং এবি পার্টির (AB Party) সাধারণ সম্পাদক ব্যারিস্টার আসাদুজ্জামান ফুয়াদ। ধর্মীয় ও বুদ্ধিবৃত্তিক অঙ্গন থেকে উপস্থিত ছিলেন প্রখ্যাত আলেমে দ্বীন সাইয়্যেদ কামালুদ্দীন আব্দুল্লাহ জাফরী, বিশিষ্ট ইসলামী চিন্তক ও গবেষক মুফতি কাজী মোহাম্মদ ইব্রাহীম, তা‘মীরুল মিল্লাত ট্রাস্টের সেক্রেটারি অধ্যক্ষ মাওলানা জয়নুল আবেদীন এবং তানযীমুল উম্মাহ ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান হাবিবুল্লাহ মু. ইকবালসহ আরও অনেকে। এছাড়াও নবনির্বাচিত সংসদ সদস্য ও বিভিন্ন ছাত্রসংগঠনের প্রতিনিধিরা এই আয়োজনে অংশ নেন।
সিয়াম সাধনা ও তাকওয়া অর্জনের ডাক
প্রধান অতিথির বক্তব্যে জামায়াত আমির ডা. শফিকুর রহমান পবিত্র রমজানের অন্তর্নিহিত তাৎপর্য তুলে ধরেন। তিনি বলেন, “রোজার মূল উদ্দেশ্য হলো তাকওয়া (Taqwa) অর্জন করা। ১১ মাস আল্লাহ আমাদের যে অগণিত নেয়ামতে ডুবিয়ে রাখেন, এক মাসের কৃচ্ছ্রসাধনের মাধ্যমে মানুষ যেন তার কদর করতে শেখে।” তিনি সতর্ক করে বলেন, কিয়ামতের দিন প্রতিটি নেয়ামতের হিসাব দিতে হবে, তাই রমজান আমাদের আত্মশুদ্ধি ও দায়িত্বশীলতার শিক্ষা দেয়।
নির্বাচন ও আইনশৃঙ্খলার অবনতি নিয়ে গভীর উদ্বেগ
সভাপতির বক্তব্যে শিবিরের কেন্দ্রীয় সভাপতি নূরুল ইসলাম বর্তমান সরকারের বৈধতা ও দেশের অস্থিতিশীল পরিস্থিতি নিয়ে কড়া সমালোচনা করেন। তিনি বলেন, “আমরা এমন এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছি যখন একটি প্রশ্নবিদ্ধ নির্বাচনের মাধ্যমে সরকার গঠিত হয়েছে। বিভিন্ন মহলে ‘ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিং’ (Election Engineering) নিয়ে জোরালো প্রশ্ন উঠেছে, যা আমাদের গণতন্ত্রের জন্য চরম উদ্বেগের।”
তিনি দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি উল্লেখ করে বলেন, “সরকার গঠনের পর থেকেই নারী নির্যাতন ও ধর্ষণের মতো জঘন্য অপরাধ বেড়েছে। বিরোধী মতের ওপর প্রতিহিংসামূলক হামলা অব্যাহত রয়েছে।” বিশেষ করে ঢাকা পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট এবং জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে (JNU) ছাত্রশিবিরের নেতাকর্মী ও সাংবাদিকদের ওপর ছাত্রদলের সশস্ত্র হামলার তীব্র নিন্দা জানান তিনি।
বিএনপি ও আওয়ামী লীগ প্রসঙ্গে কঠোর বার্তা
নূরুল ইসলাম তার বক্তব্যে বিএনপি ও আওয়ামী লীগের সাম্প্রতিক ভূমিকা নিয়ে সোজাসাপ্টা কথা বলেন। তিনি অভিযোগ করেন, “গণ-অভ্যুত্থানের সবচেয়ে বড় বেনিফিশিয়ারি (Beneficiary) হলো বিএনপি। রাজনৈতিকভাবে প্রায় নিশ্চিহ্ন হয়ে যাওয়া একটি দল গণ-আন্দোলনের ওপর ভর করে পুনরায় রাজনীতিতে ফেরার সুযোগ পেয়েছে। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত তারা এখন সেই অভ্যুত্থানের ম্যান্ডেট (Mandate) ও জনগণের রায়ের সঙ্গেই প্রতারণা করছে।”
একই সঙ্গে আওয়ামী লীগের পুনর্বাসনের চেষ্টার বিরুদ্ধে হুঁশিয়ারি দিয়ে তিনি বলেন, “হাজারো মানুষকে হত্যা করার পর যারা পুনরায় দেশে অস্থিতিশীলতা সৃষ্টির আস্ফালন দেখাচ্ছে, তাদের রাজনীতিতে ফেরানোর চেষ্টা হবে জনগণের সঙ্গে বড় বেইমানি।” বক্তব্যের শেষে তিনি ঐতিহাসিক ‘বদর দিবস’-এর বীর শহীদদের স্মরণ করে সত্য ও ন্যায়ের পক্ষে সংগ্রাম জারি রাখার আহ্বান জানান।