বাংলাদেশে সংসদীয় গণতন্ত্রের এক নতুন অধ্যায় রচনার লক্ষ্যে বিরোধী দলকে রাজনৈতিক অংশীদারিত্বের আহ্বান জানিয়েছে সরকার। নতুন রাজনৈতিক সংস্কৃতি ও উদারতা প্রদর্শনের অংশ হিসেবে বিরোধী দলকে দেওয়া ডেপুটি স্পিকারের (Deputy Speaker) পদটি গ্রহণ করা উচিত বলে মন্তব্য করেছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। শুক্রবার (৬ মার্চ) সকালে নবনির্বাচিত সংসদ সদস্য ও মন্ত্রীদের জন্য আয়োজিত এক বিশেষ প্রশিক্ষণ কর্মশালার উদ্বোধন শেষে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে তিনি এই আহ্বান জানান।
রাজনৈতিক উদারতা ও ডেপুটি স্পিকার পদ
সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, বর্তমান সরকার জাতীয় সংসদে একচেটিয়া আধিপত্যের পরিবর্তে একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক সংসদীয় পরিবেশ গড়ে তুলতে আগ্রহী। তিনি উল্লেখ করেন, “আমরা সংখ্যাধিক্য অর্জন করা সত্ত্বেও বিরোধী দলকে ডেপুটি স্পিকার পদের প্রস্তাব দিয়েছি। এটি কেবল একটি পদ নয়, বরং আমাদের রাজনৈতিক উদারতার (Political Magnanimity) বহিঃপ্রকাশ। আমরা চাই সংসদের কার্যক্রমে বিরোধী দলের কার্যকর অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে।”
লিখিত প্রস্তাবের বিতর্ক ও আইনি ব্যাখ্যা
বিরোধী দলের পক্ষ থেকে এই প্রস্তাবের জন্য ‘লিখিত আবেদন’ চাওয়ার প্রেক্ষিতে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী কিছুটা বিস্ময় প্রকাশ করেন। তিনি পরিষ্কার জানিয়ে দেন যে, এ ধরনের প্রস্তাবের ক্ষেত্রে কোনো বিশেষ আইনি বিধান বা বাধ্যবাধকতা নেই। মন্ত্রী বলেন, “আমি শুনেছি তাদের কেউ কেউ লিখিত প্রস্তাব চাইছেন। কিন্তু সংসদীয় বিধানে এমন কোনো বাধ্যবাধকতা নেই। প্রধানমন্ত্রী নিজেই ইফতার মাহফিলে বিরোধীদলীয় নেতার সঙ্গে এ বিষয়ে কথা বলেছেন, যেখানে আমিও উপস্থিত ছিলাম। সবকিছু লিখিত বা শর্তযুক্ত হতে হবে এমন নয়; সুস্থ রাজনৈতিক প্র্যাকটিস (Practice) বজায় রাখাই এখন মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত।”
সংবিধান সংশোধন ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা
সংসদীয় কাঠামোকে আরও শক্তিশালী করতে সরকারের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার কথা তুলে ধরেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। তিনি জানান, আসন্ন ‘কন্সটিটিউশনাল অ্যামেন্ডমেন্ট’ (Constitutional Amendment) বা সংবিধান সংশোধনের মাধ্যমে ভবিষ্যতে দুটি ডেপুটি স্পিকারের পদ সৃজন করার পরিকল্পনা রয়েছে সরকারের। সেক্ষেত্রে একটি পদ বিরোধী দলের জন্য সংরক্ষিত থাকবে। তবে বিদ্যমান যে পদটি খালি রয়েছে, সেটিও এখনই বিরোধী দলকে ছেড়ে দেওয়ার বিষয়ে সরকার আন্তরিক। বিষয়টি বিরোধীদের আরও উদারভাবে দেখা উচিত বলে তিনি মনে করেন।
সংসদীয় রীতি ও রাষ্ট্রপতির মর্যাদা
রাষ্ট্রপতির আসন্ন ভাষণ ও সংসদীয় রীতি প্রসঙ্গে কথা বলতে গিয়ে সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, সংসদীয় ব্যবস্থায় রাষ্ট্রপতি কোনো ব্যক্তি নন, বরং তিনি একটি রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান। সংবিধান ও ‘রুলস অব প্রসিডিউর’ (Rules of Procedure) অনুযায়ী রাষ্ট্রপতি সংসদ অধিবেশনের শুরুতে ভাষণ দেবেন এবং সরকার সেই ঐতিহ্যগত নিয়ম যথাযথভাবে মেনে চলবে। তিনি বলেন, “আমরা আমাদের ‘পার্লামেন্টারি কালচার’কে (Parliamentary Culture) এমন উচ্চতায় নিয়ে যেতে চাই, যা দেখে বিশ্ববাসী আমাদের প্রশংসা করবে। আমরা ভর্ৎসনার রাজনীতি থেকে বেরিয়ে আসতে চাই।”
গণ-অভ্যুত্থান পরবর্তী নতুন প্রত্যাশা
ছাত্র-জনতার ঐতিহাসিক গণ-অভ্যুত্থানের (Mass Uprising) মাধ্যমে জনমনে যে নতুন প্রত্যাশা সৃষ্টি হয়েছে, তা পূরণে এই সংসদকে স্মরণীয় করে রাখার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। তিনি বলেন, “সারা বিশ্বের দৃষ্টি এখন বাংলাদেশের ওপর। আমরা কীভাবে একটি সুস্থ ও কার্যকর সংসদীয় সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠা করছি, তা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বর্তমান প্রজন্মের আকাঙ্ক্ষা অনুযায়ী আমরা একটি স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক শাসনব্যবস্থা উপহার দিতে চাই।”
উল্লেখ্য, এদিন সকালে রাজধানীর গুলশানে জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনকে সামনে রেখে নবনির্বাচিত এমপি এবং মন্ত্রীদের জন্য দুই দিনব্যাপী প্রশিক্ষণ কর্মশালার উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। সাবেক অভিজ্ঞ আমলা ও সংশ্লিষ্ট বিষয়ের গবেষকদের মাধ্যমে পরিচালিত এই কর্মশালার মূল উদ্দেশ্য হলো সংসদীয় রীতিনীতি ও আইনি কাঠামো সম্পর্কে জনপ্রতিনিধিদের সম্যক ধারণা প্রদান করা।