ইরান-আমেরিকা উত্তেজনা আর আন্তর্জাতিক ভূ-রাজনীতির প্রভাবে বিশ্ববাজারে তেলের দাম বাড়ার খবরে অস্থির হয়ে উঠেছে দেশের জ্বালানি খাত। গভীর রাত পর্যন্ত পেট্রোল পাম্পগুলোতে যানবাহনের দীর্ঘ সারি আর গ্রাহকদের চোখেমুখে উদ্বেগের ছাপ—সবার মনে একটাই প্রশ্ন, দেশ কি তবে বড় কোনো জ্বালানি সংকটের মুখে? তবে মাঠপর্যায়ের এই অস্থিরতাকে বিশেষজ্ঞরা তেলের অভাবের চেয়ে ‘Panic Buying’ বা আতঙ্কিত হয়ে অতিরিক্ত ক্রয়ের ফল হিসেবেই দেখছেন। নীতিনির্ধারকদের দাবি, বাংলাদেশের পেট্রোল ও অকটেন সরবরাহ ব্যবস্থা আন্তর্জাতিক বাজারের আকস্মিক ঝাপটা সামলানোর মতো যথেষ্ট শক্তিশালী।
পেট্রোল ও অকটেনে স্বয়ংসম্পূর্ণ বাংলাদেশ: নেপথ্যের বিজ্ঞান
সাধারণ মানুষের একটি বড় অংশই জানেন না যে, বাংলাদেশে ব্যবহৃত পেট্রোলের সিংহভাগই আমদানিনির্ভর নয়। প্রাকৃতিক গ্যাস উত্তোলনের সময় উপজাত (By-product) হিসেবে পাওয়া ‘কনডেনসেট’ থেকে এই পেট্রোল উৎপাদিত হয়। এটি সম্পূর্ণ দেশীয় উৎস। দেশের চাহিদার তুলনায় পেট্রোল ও অকটেনের উৎপাদন ক্ষমতা বর্তমানে অনেক বেশি। এমনকি অতীতে অতিরিক্ত কনডেনসেট ব্যবহারের জায়গা না পেয়ে পুড়িয়ে ফেলার নজিরও রয়েছে। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম বাড়লেও দেশীয় পেট্রোল সরবরাহে তার সরাসরি প্রভাব পড়ার কোনো যৌক্তিক কারণ নেই।
মান নিয়ন্ত্রণ ও অকটেন রেটিং (Octane Rating)
জ্বালানির গুণগত মান নিয়ে গ্রাহকদের মনে প্রায়ই সংশয় থাকে। পেট্রোলের মান নির্ধারিত হয় এর ‘Octane Rating’ দিয়ে। বাংলাদেশে উৎপাদিত সাধারণ পেট্রোলের রেটিং সাধারণত ৮০ থেকে ৮৭-এর মধ্যে থাকে। অন্যদিকে, বাজারে ‘অকটেন’ হিসেবে যা বিক্রি হয়, তার রেটিং ৮৭ থেকে ৯১ পর্যন্ত। এই মান উন্নত করতে বিদেশ থেকে নির্দিষ্ট পরিমাণে ‘অকটেন বুস্টার’ আমদানি করে দেশীয় তেলের সঙ্গে মেশানো হয়। এই প্রক্রিয়ায় উৎপাদিত জ্বালানি যেমন সাশ্রয়ী, তেমনি আন্তর্জাতিক মানের সাথেও সামঞ্জস্যপূর্ণ।
রিফাইনারি ও উৎপাদন সক্ষমতা
বর্তমানে সরকারি প্রতিষ্ঠান ইস্টার্ন রিফাইনারি লিমিটেড (ERL) ছাড়াও দেশের জ্বালানি চাহিদা মেটাতে একগুচ্ছ বেসরকারি প্রতিষ্ঠান সক্রিয় ভূমিকা পালন করছে। সুপার রিফাইনারি, পিএইচপি পেট্রো, একুয়া মিনারেল এবং জেবি রিফাইনারির মতো প্রতিষ্ঠানগুলোর সম্মিলিত বার্ষিক উৎপাদন ক্ষমতা প্রায় ১৬ লাখ টন। উল্লেখ্য যে, এই উৎপাদন সক্ষমতা দেশের মোট বার্ষিক চাহিদার প্রায় দ্বিগুণ। সুতরাং, সরবরাহের তুলনায় মজুত বা উৎপাদন নিয়ে দুশ্চিন্তার অবকাশ নেই বললেই চলে।
ডিজেল সরবরাহ ও পাইপলাইন সুবিধা
পেট্রোল-অকটেন দেশীয় হলেও ডিজেল মূলত আমদানিনির্ভর। তবে ডিজেলের ‘Supply Chain’ সচল রাখতে সরকার কৌশলগত অবকাঠামো উন্নয়নে জোর দিয়েছে। ২০২৩ সালে চালু হওয়া ‘বাংলাদেশ-ভারত মৈত্রী পাইপলাইন’-এর মাধ্যমে বছরে প্রায় ১০ লাখ টন ডিজেল সরাসরি উত্তরাঞ্চলের জেলাগুলোতে সরবরাহ করা হচ্ছে। এই পাইপলাইন প্রকল্পটি জ্বালানি নিরাপত্তার ক্ষেত্রে একটি ‘Game Changer’ হিসেবে প্রমাণিত হয়েছে, যা আমদানিকৃত ডিজেল দ্রুত ও সাশ্রয়ীভাবে তৃণমূল পর্যায়ে পৌঁছে দিচ্ছে।
রেশনিং ব্যবস্থা: সংকট নাকি সতর্কতা?
বাজার স্থিতিশীল রাখতে এবং অবৈধ মজুত রোধে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (BPC) একটি নির্দিষ্ট ‘Rationing System’ বা বিক্রয় সীমা নির্ধারণ করে দিয়েছে। নতুন নিয়ম অনুযায়ী:
মোটরসাইকেল ও স্কুটার: সর্বোচ্চ ২ লিটার।
প্রাইভেট কার: সর্বোচ্চ ১০ লিটার।
জিপ ও মাইক্রোবাস: ২০–২৫ লিটার।
পিকআপ ও লোকাল বাস: ৭০–৮০ লিটার (ডিজেল)।
দূরপাল্লার যানবাহন: ২০০–২২০ লিটার (ডিজেল)।
প্রতিবার তেল কেনার সময় পূর্বের ক্রয়ের রসিদ প্রদর্শন বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। এই রেশনিং ব্যবস্থাটি মূলত ‘Panic Buying’ নিয়ন্ত্রণ এবং ভবিষ্যতের অনিশ্চয়তা মোকাবিলায় একটি ‘Precautionary Measure’ বা সতর্কতামূলক পদক্ষেপ।
সরকারের অভয়বার্তা ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা
জ্বালানি তেলের সংকট নিয়ে সাধারণ মানুষকে আতঙ্কিত না হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু। তিনি স্পষ্ট করেছেন যে, দেশে তেলের কোনো বাস্তব অভাব নেই। মন্ত্রী জানান, “আন্তর্জাতিক পর্যায়ে একটি যুদ্ধ পরিস্থিতি চলছে বলে আমাদের কিছুটা হিসেব করে চলতে হচ্ছে। মানুষ ভয়ের কারণে তেল মজুত করা শুরু করায় পাম্পগুলোতে চাপ বাড়ছে। তবে সরবরাহ ব্যবস্থা স্বাভাবিক রাখতে ৯ মার্চের মধ্যে আরও দুটি তেলবাহী বড় জাহাজ (Vessel) বন্দরে ভিড়বে।”
উপসংহার
আন্তর্জাতিক রাজনীতির অস্থিরতা এবং হরমুজ প্রণালির সংকটের কারণে বৈশ্বিক তেলের বাজারে ভবিষ্যতে কিছু অস্থিরতা দেখা দিতে পারে। তবে বাংলাদেশের জ্বালানি খাতের মৌলিক কাঠামো এবং অভ্যন্তরীণ উৎপাদন ক্ষমতা যথেষ্ট মজবুত। এই মুহূর্তে সাধারণ গ্রাহকদের জন্য সবচেয়ে বড় পরামর্শ হলো—গুজবে কান না দিয়ে এবং অতিরিক্ত তেল মজুত না করে স্বাভাবিক ব্যবহার বজায় রাখা। কারণ, কৃত্রিম চাহিদাই অনেক সময় বড় সংকটের জন্ম দেয়।