মধ্যপ্রাচ্যের ক্রমবর্ধমান উত্তেজনা এবং উপসাগরীয় দেশগুলোর শহরাঞ্চলে সাম্প্রতিক হামলার জন্য সরাসরি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে দায়ী করেছে ইরান। বুধবার (১৮ মার্চ) আল জাজিরাকে দেওয়া এক বিশেষ সাক্ষাৎকারে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, এই অস্থিতিশীল পরিস্থিতির নেপথ্যে রয়েছে মার্কিন বাহিনীর হঠকারী অবস্থান। তাঁর দাবি, মার্কিন সেনারা তাদের নির্ধারিত Military Base বা সামরিক ঘাঁটি ছেড়ে ঘনবসতিপূর্ণ এলাকার হোটেলগুলোতে আশ্রয় নেয়ায় সাধারণ মানুষ ঝুঁকির মুখে পড়েছে।
মার্কিন কৌশল ও ইরানের লক্ষ্যবস্তু আরাঘচি তাঁর সাক্ষাৎকারে বলেন, "আমাদের লক্ষ্য কেবল শত্রুপক্ষের আনুষ্ঠানিক সামরিক স্থাপনাগুলোর মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না। যেখানে যেখানে মার্কিন বাহিনীর উপস্থিতি এবং তাদের পরিকাঠামো ছিল, সেখানেই আঘাত হানা হয়েছে।" তিনি যুক্তি দেন যে, হামলার কিছু কেন্দ্রবিন্দু শহরাঞ্চলের কাছাকাছি হওয়ার দায় সম্পূর্ণভাবে পেন্টাগনের। মার্কিন বাহিনী পরিকল্পিতভাবে ঘাঁটি ছেড়ে লোকালয়ে চলে আসায় এই পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। সামগ্রিকভাবে, মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান অবস্থান ও আচরণকেই এই সংঘাতের মূল কারণ হিসেবে চিহ্নিত করেন তিনি।
সাময়িক যুদ্ধবিরতি নয়, চাই পূর্ণ অবসান বর্তমান ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে ইরান কেবল একটি সাময়িক Ceasefire বা যুদ্ধবিরতিতে আগ্রহী নয়। পররাষ্ট্রমন্ত্রী স্পষ্টভাবে জানান, তেহরান এখন ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যুদ্ধের সম্পূর্ণ অবসান চায় এবং তা সব ফ্রন্টে। দীর্ঘমেয়াদী স্থিতিশীলতার জন্য ইরান তার অবস্থান থেকে একচুলও নড়বে না বলে ইঙ্গিত দিয়েছেন তিনি।
হরমুজ প্রণালী ও নতুন নৌ-নিরাপত্তা বিধি বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক রুট হরমুজ প্রণালী (Strait of Hormuz) নিয়ে ইরানের পরিকল্পনার কথা তুলে ধরেন আরাঘচি। তিনি বলেন, যুদ্ধ পরবর্তী সময়ে এই কৌশলগত নৌপথে জাহাজ চলাচলের জন্য নতুন ও কঠোর নিয়ম-কানুন প্রণয়ন করা অপরিহার্য। ভবিষ্যতে আন্তর্জাতিক বিধিমালা বা International Regulations-এর আওতায় এই অঞ্চলে স্থায়ী শান্তি ও নিরাপদ নেভিগেশন নিশ্চিত করতে নতুন একটি ফ্রেমওয়ার্ক তৈরির প্রস্তাব দেন তিনি।
১৯তম দিনে সংঘাতের ভয়াবহ চিত্র ইরান ও ইসরায়েল-যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার এই সরাসরি সামরিক সংঘাত আজ ১৯তম দিনে পদার্পণ করেছে। যুদ্ধের ভয়াবহতা এখন কেবল সীমান্তে নয়, দুই দেশের মূল ভূখণ্ডেও দৃশ্যমান।
ইরানের ক্ষয়ক্ষতি: ইসরায়েল দাবি করেছে, তেহরানে গত রাতের সুনির্দিষ্ট হামলায় ইরানের গোয়েন্দা মন্ত্রী ইসমাইল খতিবসহ মন্ত্রণালয়ের একাধিক শীর্ষ কর্মকর্তা নিহত হয়েছেন। তবে তেহরান এখন পর্যন্ত এই বিষয়ে কোনো আনুষ্ঠানিক বিবৃতি দেয়নি। এছাড়া লোরিস্তান প্রদেশের দোরুদ শহরে আবাসিক এলাকায় মার্কিন-ইসরায়েলি হামলায় ৭ জন বেসামরিক নাগরিক নিহত এবং ৫৬ জন আহত হয়েছেন।
ইসরায়েলে পাল্টা আঘাত: ইরান একাধিক Warhead বা বিস্ফোরকবাহী শক্তিশালী ক্ষেপণাস্ত্র দিয়ে মধ্য ইসরায়েলে পাল্টা হামলা চালিয়েছে। তেল আবিবের নিকটবর্তী রামাত গান এলাকায় এই ক্ষেপণাস্ত্র আঘাতে ২ জন নিহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। যদিও ইসরায়েলি Missile Defense System বেশ কিছু ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করতে সক্ষম হয়েছে।
আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া সংঘাতের আঁচ লেগেছে প্রতিবেশী দেশগুলোতেও। কাতার, কুয়েত, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও সৌদি আরব জানিয়েছে, তারা তাদের আকাশসীমা সুরক্ষায় ইরান থেকে ছোঁড়া বেশ কিছু ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করেছে। অন্যদিকে, লেবাননের রাজধানী বৈরুতের বাশৌরা এলাকায় ইসরায়েলি হামলায় ২০ জনেরও বেশি মানুষের প্রাণহানি ঘটেছে। দক্ষিণ লেবাননে জাতিসংঘের শান্তিরক্ষী বাহিনীর (Peacekeeping Force) ওপর ইসরায়েলি ট্যাংকের গোলাবর্ষণে ঘানার ৩ জন শান্তিরক্ষী আহত হওয়ার ঘটনা আন্তর্জাতিক মহলে ব্যাপক সমালোচনার জন্ম দিয়েছে। গাজার খান ইউনিসেও ইসরায়েলি আগ্রাসনে প্রাণহানির ঘটনা অব্যাহত রয়েছে।
বর্তমান এই সংকটময় পরিস্থিতি কেবল মধ্যপ্রাচ্য নয়, বরং বিশ্ব রাজনীতি ও অর্থনীতির জন্য এক বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। তেহরানের কড়া হুঁশিয়ারি এবং যুদ্ধের ময়দানে পাল্টাপাল্টি হামলার এই ধারা কতদূর গড়ায়, এখন সেটাই দেখার বিষয়।