দেশের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে বড় ধরনের কৌশলগত পরিবর্তনের আভাস দিচ্ছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। আগামী স্থানীয় সরকার নির্বাচনগুলোতে কোনো জোটবদ্ধ সমীকরণে না গিয়ে এককভাবে লড়ার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিয়েছে দলটি। সিটি করপোরেশন, পৌরসভা এবং উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে নিজস্ব সাংগঠনিক শক্তিতে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে ইতিমধ্যে মাঠপর্যায়ে প্রার্থী বাছাইয়ের আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়া (Selection Process) শুরু করেছে জামায়াত। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই সিদ্ধান্তের মাধ্যমে দলটি নিজেদের জনসমর্থনের প্রকৃত পাল্লা মেপে নিতে চাইছে।
নির্বাচনী প্রস্তুতিতে ‘অ্যাকশন মোড’: প্রার্থী বাছাইয়ের নতুন ছক
জামায়াতের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের সূত্রগুলো নিশ্চিত করেছে, চলতি মাসেই প্রার্থী বাছাইয়ের প্রাথমিক কাজ শেষ করার লক্ষ্যমাত্রা (Target) নির্ধারণ করা হয়েছে। দলটির আমির ডা. শফিকুর রহমান ইতিমধ্যে সারা দেশের নেতাকর্মীদের নির্বাচনী প্রস্তুতি গ্রহণের বিশেষ নির্দেশনা দিয়েছেন। তিনি স্পষ্ট করেছেন, কোনো সাময়িক ‘অপকৌশল’ নয়, বরং একটি সুসংগঠিত রাজনৈতিক কৌশলের (Political Strategy) মাধ্যমেই আগামী দিনের নির্বাচনী চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে চায় জামায়াত।
সংগঠনটির তৃণমূল পর্যায়ের কমিটিগুলোকে প্রতিটি স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের জন্য তিনজনের একটি সম্ভাব্য প্রার্থীর তালিকা বা প্যানেল কেন্দ্রে পাঠানোর নির্দেশ দেয়া হয়েছে। বিশেষ করে আসন্ন সিটি করপোরেশন নির্বাচনগুলোকে বিশেষ অগ্রাধিকার (Priority) দিয়ে এই তালিকা তৈরির প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত করা হচ্ছে।
নেতৃত্বের কণ্ঠে আত্মবিশ্বাসের সুর
জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় নির্বাচন পরিচালনা কমিটির সদস্যসচিব মাওলানা আব্দুল হালিম জানান, নির্বাচনী প্রস্তুতির কাজ এখন চূড়ান্ত পর্যায়ে। তিনি বলেন, ‘আমরা সারা দেশে পুরোদমে প্রস্তুতি নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছি। স্থানীয় পর্যায়ে আমাদের দীর্ঘদিনের সুসংগঠিত ভিত্তি রয়েছে, এখন সেটিকে চূড়ান্ত রূপ দেওয়া হচ্ছে যাতে প্রতিটি আসনে শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে কাঙ্ক্ষিত ফলাফল অর্জন করা সম্ভব হয়।’
একই সুরে কথা বলেছেন দলটির সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল এহসানুল মাহবুব জুবায়ের। তিনি জানান, সিটি করপোরেশনের জন্য তিনজনের প্যানেল কেন্দ্রে আসার পর কেন্দ্রীয় কমিটি যাচাই-বাছাই শেষে চূড়ান্ত প্রার্থীর নাম ঘোষণা করবে। জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোর ক্ষেত্রেও একই ধরনের পেশাদারিত্ব বজায় রাখা হচ্ছে।
এককভাবে লড়ার নেপথ্যে যে সমীকরণ
রাজনৈতিক বিশ্লেষণে দেখা যায়, বিগত জাতীয় নির্বাচনে জামায়াত নেতৃত্বাধীন জোটের অভাবনীয় সাফল্য দলটিকে নতুন করে আত্মবিশ্বাসী করে তুলেছে। ওই নির্বাচনে জোটগতভাবে ৭৭টি আসনে জয়লাভ করলেও এর মধ্যে এককভাবে জামায়াতই পেয়েছিল ৬৮টি আসন। বর্তমান পরিস্থিতিতে জাতীয় রাজনীতিতে নিজেদের ‘মার্কেট ভ্যালু’ (Market Value) এবং সাংগঠনিক শক্তিবৃদ্ধিকে কাজে লাগিয়ে স্থানীয় পর্যায়ে অবস্থান আরও সুসংহত করতে চায় দলটি।
জামায়াতের অভ্যন্তরীণ সূত্রের খবর, রাজনৈতিক মিত্র বা অন্য দলগুলো ইতিমধ্যে নিজ নিজ প্রার্থীর নাম ঘোষণা শুরু করেছে। এই বাস্তবতায় অন্য কোনো দলের সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় না থেকে জামায়াতও নিজস্ব ‘ফিল্ড লেভেল’ (Field Level) গুছিয়ে নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। কেন্দ্র থেকে সম্ভাব্য প্রার্থীদের সবুজ সংকেত (Green Signal) দেওয়া হলে পবিত্র ঈদুল ফিতরের পর থেকেই প্রার্থীরা পুরোদমে প্রচার-প্রচারণায় নামবেন বলে জানা গেছে।
জুলাই স্পিরিট ও আগামীর চ্যালেঞ্জ
সাম্প্রতিক সময়ে সিটি করপোরেশনে দলীয় প্রশাসক নিয়োগের বিষয়টি নিয়ে সরব হয়েছে জামায়াত। দলটির পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, প্রশাসক নিয়োগের ক্ষেত্রে ‘জুলাই স্পিরিট’ বা ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের আকাঙ্ক্ষাকে অবজ্ঞা করা হয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে স্থানীয় নির্বাচনে নিজেদের একক সক্ষমতা প্রদর্শনের মাধ্যমে জামায়াত প্রমাণ করতে চায় যে, তারা কেবল জোটের ওপর নির্ভরশীল নয়, বরং একক রাজনৈতিক শক্তি হিসেবেও ভোটারদের মাঝে শক্তিশালী আবেদন তৈরি করতে সক্ষম।