মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনীতি ও সামরিক সংঘাত এখন এক ভয়াবহ মোড় নিয়েছে। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরান ভূখণ্ডে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের নজিরবিহীন যৌথ বিমান হামলার পর থেকেই রণক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে এই অঞ্চল। ওই হামলায় ইরানের শীর্ষস্থানীয় নেতৃবৃন্দসহ কয়েক’শ মানুষের মৃত্যুর প্রতিশোধ নিতে মরিয়া তেহরান। এরই ধারাবাহিকতায় ইসরাইল ও উপসাগরীয় অঞ্চলের মার্কিন ঘাঁটি লক্ষ্য করে মুহুর্মুহু ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা (Drone Strike) চালিয়ে যাচ্ছে ইরান। তবে এই ধ্বংসলীলার মাঝেও এক বিষ্ময়কর ও রোমহর্ষক চিত্র সামনে এসেছে ইসরাইলের রেহোভত শহর থেকে—যেখানে একটি আবাসিক বাড়ির বসার ঘরের মেঝের ওপর পড়ে আছে আস্ত একটি অবিস্ফোরিত ইরানি ক্ষেপণাস্ত্র।
রেহোভত শহরে অলৌকিক রক্ষা আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম স্কাই নিউজের (Sky News) এক বিশেষ প্রতিবেদনে এই চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে এসেছে। রাজধানী তেল আবিব থেকে মাত্র ২০ কিলোমিটার দক্ষিণে অবস্থিত রেহোভত শহর। সেখানকার একটি বহুতল আবাসিক ভবনের মেঝেতে ক্ষেপণাস্ত্রটি গেঁথে থাকার ছবি এখন বিশ্বজুড়ে ভাইরাল। প্রত্যক্ষদর্শীদের পাঠানো ছবিতে দেখা যায়, শক্তিশালী ওই ক্ষেপণাস্ত্রটি ঘরের ছাদ ফুঁড়ে সরাসরি ড্রয়িংরুমের মেঝেতে আছড়ে পড়েছে। হামলায় ঘরের মূল্যবান আসবাবপত্র চুরমার হয়ে গেলেও মূল কাঠামো ও বসার ঘরের বড় অংশটি অলৌকিকভাবে বড় কোনো বিস্ফোরণ থেকে রক্ষা পেয়েছে।
উদ্ধার অভিযান ও জরুরি অবস্থা ক্ষেপণাস্ত্রটি পড়ার পরপরই আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে পুরো এলাকায়। ঘটনাস্থলে দ্রুত পৌঁছান ইসরাইল ফায়ার অ্যান্ড রেসকিউ অথরিটির (Fire & Rescue Authority) বিশেষায়িত দল। ওই বাসভবনে বসবাসকারী একটি পরিবার তখন ভেতরেই আটকা পড়ে ছিল। ইসরাইলের জরুরি চিকিৎসাসেবা সংস্থা ‘মাগেন ডেভিড অ্যাডম’-এর মুখপাত্র জানিয়েছেন, তাদের প্যারামেডিকরা (Paramedics) অত্যন্ত সাহসিকতার সঙ্গে পরিবারের প্রতিটি সদস্যকে অক্ষত অবস্থায় উদ্ধার করেছেন। যদিও মানসিকভাবে তারা চরম ট্রমার শিকার, কিন্তু শারীরিকভাবে কেউ গুরুতর জখম হননি। এরপরই বিস্ফোরক বিশেষজ্ঞরা ক্ষেপণাস্ত্রটি নিষ্ক্রিয় করার প্রক্রিয়ায় হাত দেন।
ইরানের আইআরজিসি-র দাবি ও লক্ষ্যবস্তু অন্যদিকে, ইরানের শক্তিশালী সামরিক শাখা ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোর (IRGC) তাদের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যমের মাধ্যমে ভিন্ন দাবি করেছে। তাদের মতে, সর্বশেষ এই পাল্টাপাল্টি হামলায় তারা ইসরাইলের সাধারণ কোনো ঘরবাড়ি নয়, বরং অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও কৌশলগত ‘Strategic Infrastructure’ লক্ষ্য করে আঘাত হেনেছে। তেহরানের দাবি অনুযায়ী, তাদের লক্ষ্যবস্তুতে ছিল ইসরাইলের প্রধান স্যাটেলাইট নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্র, উন্নত রাডার সিস্টেম এবং বিভিন্ন সামরিক প্রতিরক্ষা কেন্দ্র (Defense Centers)। বিশেষ করে ইসরাইলের দক্ষিণ, মধ্য ও উত্তরাঞ্চলের স্পর্শকাতর স্থাপনাগুলোতে ড্রোন ও মিসাইল দিয়ে নিখুঁত নিশানায় আঘাত করা হয়েছে বলে দাবি করেছে আইআরজিসি।
আঞ্চলিক উত্তেজনা ও জ্বালানি সংকট ক্ষেপণাস্ত্রের এই লড়াই কেবল সীমান্ত বা আবাসিক এলাকাতেই সীমাবদ্ধ নেই। সম্প্রতি ইসরাইলের একটি গুরুত্বপূর্ণ তেল শোধনাগারেও (Oil Refinery) ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে ইরান, যা বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে নতুন উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে। এমনকি কাতার ও মধ্যপ্রাচ্যের অন্যান্য এলএনজি (LNG) সরবরাহকারী দেশগুলোও এই সংঘাতের প্রভাবে তাদের সরবরাহ ব্যবস্থা ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা করছে।
সামরিক বিশ্লেষকদের মতে, ইরানের এই আক্রমণাত্মক ভঙ্গি এবং ইসরাইলের অভ্যন্তরে আবাসিক এলাকায় ক্ষেপণাস্ত্র পৌঁছে যাওয়ার ঘটনাটি প্রমাণ করে যে, এই সংঘাত খুব শীঘ্রই থামার লক্ষণ নেই। রেহোভতের সেই বাড়ির মেঝেতে পড়ে থাকা অবিস্ফোরিত মিসাইলটি এখন যুদ্ধের এক বিভীষিকাময় প্রতীকে পরিণত হয়েছে।