বিশ্ব রাজনীতির উত্তপ্ত মঞ্চে এবার এক নজিরবিহীন সামরিক সংঘাতের খবর সামনে এল। ইরান থেকে প্রায় ৪ হাজার কিলোমিটার দূরে ভারত মহাসাগরের গভীরে অবস্থিত অতি গুরুত্বপূর্ণ মার্কিন ও ব্রিটিশ সামরিক ঘাঁটি ‘দিয়াগো গার্সিয়া’ লক্ষ্য করে অন্তত দুটি মাঝারি পাল্লার ‘Ballistic Missile’ বা ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়েছে ইরান। প্রভাবশালী মার্কিন সংবাদমাধ্যম ‘The Wall Street Journal’ এবং ‘CNN’ একাধিক উচ্চপদস্থ মার্কিন কর্মকর্তার বরাত দিয়ে এই চাঞ্চল্যকর প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। তেহরানের এই পদক্ষেপ কেবল একটি আক্রমণ নয়, বরং বৈশ্বিক সামরিক ভারসাম্যের ক্ষেত্রে এক নতুন সতর্কবার্তা হিসেবে দেখা হচ্ছে।
আক্রমণের বিবরণ ও প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার সক্রিয়তা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইরান থেকে ছোড়া এই ক্ষেপণাস্ত্রগুলো সরাসরি মার্কিন-যুক্তরাজ্যের যৌথ সামরিক ঘাঁটিতে আঘাত হানতে সক্ষম হয়নি। প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, দুটি ক্ষেপণাস্ত্রের মধ্যে একটি উড্ডয়নকালীন কারিগরি ত্রুটির (Mid-air Malfunction) কারণে মাঝপথেই লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়। অন্য ক্ষেপণাস্ত্রটি দিয়াগো গার্সিয়ার কাছাকাছি পৌঁছালে মার্কিন যুদ্ধজাহাজ থেকে ছোড়া অত্যাধুনিক ‘Interceptor’ বা ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরোধ ব্যবস্থার মাধ্যমে আকাশেই ধ্বংস করে দেওয়া হয়। তবে ঠিক কখন এই হামলা চালানো হয়েছিল এবং ক্ষেপণাস্ত্রগুলো সফলভাবে প্রতিহত করা গেছে কি না, তা নিয়ে পেন্টাগন বা ব্রিটিশ প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় এখনো কোনো আনুষ্ঠানিক বিবৃতি দেয়নি।
দিয়াগো গার্সিয়া: কেন এই ঘাঁটি এতো গুরুত্বপূর্ণ? ভারত মহাসাগরের ঠিক মাঝখানে বিষুবরেখার দক্ষিণে অবস্থিত দিয়াগো গার্সিয়া দ্বীপটি পেন্টাগনের জন্য এক অত্যন্ত ‘Strategic Base’ বা কৌশলগত ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত। এটি মার্কিন বিমানবাহিনীর ভারী বোমারু বিমান (Heavy Bomber) পরিচালনার প্রধান কেন্দ্র। মধ্যপ্রাচ্য, দক্ষিণ এশিয়া এবং ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে সামরিক আধিপত্য বজায় রাখতে এই ঘাঁটিটি যুক্তরাষ্ট্রের জন্য অপরিহার্য। এই ঘাঁটিতে হামলার দুঃসাহস দেখানো মানে সরাসরি ওয়াশিংটনের সামরিক দাপটকে চ্যালেঞ্জ জানানো।
ক্ষেপণাস্ত্রের পাল্লা নিয়ে নতুন উদ্বেগ ইরানের এই হামলার খবরে সবচেয়ে বেশি চমকে ওঠার মতো তথ্য হলো ক্ষেপণাস্ত্রের দূরত্ব বা ‘Range’। এতদিন পর্যন্ত ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি দাবি করে আসছিলেন যে, তেহরান তাদের ক্ষেপণাস্ত্রের পাল্লা ২ হাজার কিলোমিটারের মধ্যে সীমাবদ্ধ রেখেছে। কিন্তু ইরান থেকে ৪ হাজার কিলোমিটার দূরে অবস্থিত দিয়াগো গার্সিয়াকে লক্ষ্যবস্তু করা এটাই প্রমাণ করে যে, ইরানের কাছে এমন দূরপাল্লার প্রযুক্তি রয়েছে যা তাদের পূর্বের দাবির চেয়ে দ্বিগুণ শক্তিশালী। এই প্রযুক্তিগত উৎকর্ষ ইসরায়েল তো বটেই, ইউরোপের অনেক দেশের জন্যও বড় ধরনের ‘Security Threat’ বা নিরাপত্তা ঝুঁকি হিসেবে দেখা দিচ্ছে।
আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া ও নীরবতা এই চাঞ্চল্যকর ঘটনার পর আন্তর্জাতিক মহলে ব্যাপক প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হলেও সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলো এখনো রহস্যজনকভাবে নীরব। বার্তা সংস্থা রয়টার্স জানিয়েছে, এ বিষয়ে মন্তব্যের জন্য হোয়াইট হাউস, ওয়াশিংটনে অবস্থিত ব্রিটিশ দূতাবাস ও ব্রিটিশ প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলেও তারা তাৎক্ষণিকভাবে কোনো সাড়া দেয়নি। অন্যদিকে, ইরানের পক্ষ থেকেও এখন পর্যন্ত কোনো দাপ্তরিক বক্তব্য বা দায় স্বীকার করা হয়নি।
বিশ্লেষকদের মতে, ইরানের এই আক্রমণ যদি সত্য হয়, তবে তা হবে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি এক চরম সতর্কবার্তা। ডোনাল্ড ট্রাম্পের যুদ্ধবিরতি নিয়ে অনাগ্রহের খবরের মাঝেই ইরানের এই ‘Missile Diplomacy’ মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনীতিকে (Geopolitics) এক অনিশ্চিত ও সংঘাতপূর্ণ ভবিষ্যতের দিকে ঠেলে দিচ্ছে।