বিশ্বজুড়ে ক্রমবর্ধমান ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনার আবহে বঙ্গোপসাগরের বুক চিরে নতুন এক সামরিক সক্ষমতার জানান দিল ভারত। দেশটির প্রতিরক্ষা শক্তির এক অনন্য নজির হিসেবে পারমাণবিক শক্তিচালিত সাবমেরিন থেকে একটি মধ্যম-পাল্লার ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের সফল পরীক্ষা চালানো হয়েছে। গত মঙ্গলবার (২৪ ডিসেম্বর) বিশাখাপত্তনম উপকূলে এই মহড়া সম্পন্ন হয়, যা ভারতের সামরিক ইতিহাসে এক গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
বিশাখাপত্তনম উপকূলে ‘আইএনএস আরিঘাট’-এর বিক্রম
সংবাদমাধ্যম এনডিটিভি ও ইন্ডিয়া টুডে’র প্রতিবেদন অনুযায়ী, মঙ্গলবার গভীর সমুদ্রে অবস্থানরত ভারতের দেশীয় প্রযুক্তিতে তৈরি পারমাণবিক শক্তিচালিত সাবমেরিন ‘আইএনএস আরিঘাট’ (INS Arighat) থেকে এই ‘কে-৪’ (K-4) ক্ষেপণাস্ত্রের পরীক্ষামূলক উৎক্ষেপণ করা হয়। বঙ্গোপসাগরের নির্দিষ্ট লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানার মাধ্যমে এই ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রটি তার নির্ভুলতা প্রমাণ করেছে। এটি ভারতের সামরিক কৌশলে ‘Nuclear-capable’ সক্ষমতাকে আরও সুসংহত করবে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
৩,৫০০ কিলোমিটারের পাল্লা ও বিশাল ধ্বংসক্ষমতা
প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় সূত্রের খবর, এই ‘কে-৪’ ক্ষেপণাস্ত্রটি ৩,৫০০ কিলোমিটার দূরের লক্ষ্যবস্তুতে নিখুঁতভাবে আঘাত হানতে সক্ষম। মূলত শত্রু শিবিরের রাডার বা নজরদারি এড়িয়ে সমুদ্রের গভীর তলদেশ থেকে আঘাত হানার জন্য এটি তৈরি করা হয়েছে। ক্ষেপণাস্ত্রটি প্রায় ২.৫ টন ওজনের পারমাণবিক ওয়ারহেড (Warhead) বহন করতে পারে। এটি অরিহন্ত-শ্রেণির (Arihant-class) সাবমেরিন থেকে উৎক্ষেপণের উপযোগী করে বিশেষভাবে নকশা করা হয়েছে।
‘নিউক্লিয়ার ট্রায়াড’ ও ভারতের কৌশলগত অবস্থান
গত বছরের ২৯ আগস্ট ভারতীয় নৌবাহিনীতে ‘কে-৪’ সাবমেরিন-লঞ্চড ব্যালিস্টিক মিসাইল (SLBM) আনুষ্ঠানিকভাবে কমিশন করা হয়। এর মাধ্যমে ভারত বিশ্বের সেই এলিট গ্রুপ বা হাতেগোনা কয়েকটি দেশের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হয়েছে, যাদের জল, স্থল এবং আকাশ—এই তিন মাধ্যম থেকেই পারমাণবিক অস্ত্র নিক্ষেপের সক্ষমতা বা ‘Nuclear Triad’ রয়েছে। মূলত ভূমি থেকে উৎক্ষেপণযোগ্য ‘অগ্নি-৩’ (Agni-III) ক্ষেপণাস্ত্রের প্রযুক্তিগত উৎকর্ষ থেকেই এই সামুদ্রিক সংস্করণটি তৈরি করা হয়েছে।
প্রতিরক্ষা গবেষণায় নতুন দিগন্ত
ভারতের ডিআরডিও (DRDO) কর্তৃক উদ্ভাবিত এই প্রযুক্তি ভারতের দীর্ঘতম পাল্লার সমুদ্র-ভিত্তিক কৌশলগত অস্ত্র (Strategic Weapon)। স্থল সংস্করণের ক্ষেপণাস্ত্রকে সমুদ্রে উৎক্ষেপণের উপযোগী করতে এতে আমূল পরিবর্তন আনা হয়েছে। বিশেষ করে সাবমেরিন থেকে নিক্ষেপের সময় প্রচণ্ড চাপ সহ্য করার জন্য এর বডি ও প্রপালশন সিস্টেমে অত্যাধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করা হয়েছে।
প্রতিরক্ষা বিশেষজ্ঞদের মতে, বঙ্গোপসাগরের এই পরীক্ষা কেবল একটি মহড়া নয়, বরং এটি ভারতের সমুদ্রসীমার নিরাপত্তা এবং প্রতিবেশী দেশগুলোর প্রতি এক শক্তিশালী বার্তা। এই সফল পরীক্ষার ফলে ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলে ক্ষমতার ভারসাম্য বজায় রাখা এবং যে কোনো প্রতিকূল পরিস্থিতিতে পাল্টা আঘাত হানার সক্ষমতা বা ‘Second Strike Capability’ অর্জনে ভারত আরও এক ধাপ এগিয়ে গেল।