দীর্ঘ ২০ বছরের প্রতীক্ষার অবসান ঘটিয়ে আধ্যাত্মিক রাজধানী সিলেটে পা রাখছেন বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান। আগামী ২২ জানুয়ারি নগরীর ঐতিহাসিক আলিয়া মাদ্রাসা মাঠ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে নির্বাচনী প্রচারণা শুরু করবেন তিনি। এই সফরকে কেন্দ্র করে কেবল বিএনপি বা এর অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীদের মধ্যেই নয়, বরং গোটা জেলা জুড়ে এক অভূতপূর্ব উৎসবের আবহাওয়া বিরাজ করছে। দুই দশক পর প্রিয় নেতার সরাসরি সান্নিধ্য পেতে রাজপথে নামার অপেক্ষায় এখন সিলেটবাসী।
পূর্বসূরিদের পদাঙ্ক অনুসরণ: ঐতিহ্য ও রাজনীতির মেলবন্ধন
বাংলাদেশে নির্বাচনের প্রাক্কালে সিলেট থেকে প্রচারণা শুরু করার একটি দীর্ঘস্থায়ী রাজনৈতিক ঐতিহ্য রয়েছে। ১৯৯১ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা প্রবর্তনের পর থেকে বিএনপির চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া বরাবরই হযরত শাহজালাল (রহ.) ও হযরত শাহপরান (রহ.)-এর মাজার জিয়ারতের মাধ্যমে প্রচারণার সূচনা করতেন। এবার সেই একই ধারায় দলের বর্তমান শীর্ষ নেতা তারেক রহমানও সিলেটকে তার ‘Political Launchpad’ হিসেবে বেছে নিয়েছেন।
বিএনপি নেতারা জানান, এই সফর কেবল একটি রাজনৈতিক কর্মসূচি নয়, বরং এটি একটি পারিবারিক ও আধ্যাত্মিক সংযোগের বহিঃপ্রকাশ। ১৯৭৮ সালে তৎকালীন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান এবং পরবর্তীতে বেগম খালেদা জিয়া যে আলিয়া মাদ্রাসা মাঠে ঐতিহাসিক জনসভায় ভাষণ দিয়েছিলেন, ঠিক সেই একই মঞ্চে দীর্ঘ সময় পর তারেক রহমানের ভাষণ দেওয়ার বিষয়টি বিশেষ গুরুত্ব বহন করছে।
‘সিলেটের জামাই’ ও জনমানুষের আবেগ
তারেক রহমানের এই সফরকে ঘিরে সিলেটের রাজনৈতিক মহলে একটি আবেগঘন স্লোগান জোরালো হয়ে উঠেছে— 'সিলেটের জামাই আসছেন'। স্থানীয়রা জানাচ্ছেন, দলীয় পরিচয়ের বাইরেও সাধারণ মানুষের মধ্যে তাকে এক নজর দেখার ব্যাপক কৌতূহল কাজ করছে। রাজনীতিতে সক্রিয় নন এমন সাধারণ নাগরিকরাও ‘সিলেটের জামাই’-এর মুখে আগামীর বাংলাদেশের রূপরেখা বা ‘Vision’ শোনার জন্য মুখিয়ে আছেন।
সিলেট মহানগর বিএনপির ভারপ্রাপ্ত সভাপতি রেজাউল হাসান কয়েস লোদী গণমাধ্যমকে বলেন, "এটি আমাদের জন্য অত্যন্ত গৌরবের বিষয়। এই পবিত্র ভূমি থেকেই তারেক রহমান আগামীর লড়াইয়ের ডাক দেবেন। প্রস্তুতি এখন শেষ পর্যায়ে, গোটা শহর এখন উৎসবের নগরী।"
নারীদের অংশগ্রহণ ও সাংগঠনিক প্রস্তুতি
সফরকে ঘিরে নারীদের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে বিশেষ উদ্যোগ নিয়েছে জাতীয়তাবাদী মহিলা দল। কেন্দ্রীয় কমিটির সহ-সভাপতি সামিয়া চৌধুরী জানান, তারেক রহমানকে কাছ থেকে দেখার জন্য সিলেটের নারী ভোটার ও নেতাকর্মীদের মধ্যে ব্যাপক উৎসাহ দেখা যাচ্ছে। বিশেষ 'Security Ring' বা নিরাপত্তা বেষ্টনী তৈরির মাধ্যমে নারীদের নিরাপদ উপস্থিতি নিশ্চিত করা হচ্ছে। সিলেট মহানগর বিএনপির সভাপতি নাসিম হোসেইন আশা প্রকাশ করেন যে, এটি হবে সিলেটের ইতিহাসে সর্বকালের বৃহত্তম ‘Public Gathering’, যার প্রভাব সমগ্র দেশের ‘Political Landscape’-এ অনুভূত হবে।
নিরাপত্তা প্রটোকল ও প্রশাসনের তৎপরতা
তারেক রহমানের সফরকে নির্বিঘ্ন করতে সিলেটে সর্বোচ্চ স্তরের নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। 'VVIP Movement' এবং বিশাল জনসমাবেশের কথা মাথায় রেখে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী তাদের ‘Security Protocol’ সাজিয়েছে। সিলেট মেট্রোপলিটন পুলিশের কমিশনার আবদুল কুদ্দুছ চৌধুরী নিশ্চিত করেছেন যে, চেয়ারম্যানের আগমন, অবস্থান এবং জনসভা ঘিরে নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তা বলয় তৈরি করা হয়েছে যাতে সাধারণ মানুষ নির্বিঘ্নে এই সমাবেশে অংশ নিতে পারেন।
সফরসূচি: আকাশপথে আগমন ও সড়কপথে প্রত্যাবর্তন
নির্ধারিত কর্মসূচি অনুযায়ী, বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান ২১ জানুয়ারি আকাশপথে সিলেটে পৌঁছাবেন। ২২ জানুয়ারি সকালে দুই ওলি-র মাজার জিয়ারত শেষে বেলা ১১টায় আলিয়া মাদ্রাসা মাঠের জনসভায় প্রধান অতিথি হিসেবে বক্তব্য রাখবেন। সফরের সমাপনী অংশে তিনি সড়কপথে ঢাকার উদ্দেশ্যে রওয়ানা হবেন। ফেরার পথে ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টে ছোট-বড় একাধিক পথসভা ও জনসমাবেশে অংশ নেওয়ার কথা রয়েছে তার, যা মূলত দলের ‘Public Outreach’ কর্মসূচিরই একটি অংশ।
দীর্ঘ দুই দশক পর তারেক রহমানের এই সিলেট সফর বাংলাদেশের রাজনীতির সমীকরণে নতুন কোনো মোড় নিয়ে আসে কি না, এখন সেটিই দেখার অপেক্ষায় রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।