দীর্ঘ ১৫ বছরের এক রুদ্ধশ্বাস প্রতীক্ষা ও বিতর্কের অবসান ঘটিয়ে অবশেষে নিজেদের অন্যতম শক্তিশালী পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র (Nuclear Power Plant) পুনরায় চালু করতে যাচ্ছে সূর্যোদয়ের দেশ জাপান। ২০১১ সালের ভয়াবহ ভূমিকম্প এবং তার পরবর্তী ফুকুশিমা পারমাণবিক বিপর্যয়ের পর থেকে বন্ধ থাকা ‘কাশিওয়াজাকি-কারিওয়া’ (Kashiwazaki-Kariwa) কেন্দ্রটি বুধবার (২১ জানুয়ারি) থেকে আবারও সচল করার প্রক্রিয়া শুরু হচ্ছে। তবে সরকারের এই উচ্চাভিলাষী সিদ্ধান্তকে কেন্দ্র করে স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও নিরাপত্তার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
অপারেশনাল রিবুট ও টেকনিক্যাল প্রস্তুতি
বিশ্বের অন্যতম বৃহত্তম এই পারমাণবিক কমপ্লেক্সটির পরিচালনাকারী সংস্থা টোকিও ইলেকট্রিক পাওয়ার কোম্পানি (TEPCO) জানিয়েছে, বুধবার সন্ধ্যা ৭টায় নিগাতা প্রদেশে অবস্থিত এই কেন্দ্রের রিঅ্যাক্টর (Reactor) থেকে নিয়ন্ত্রণ রড (Control Rod) সরিয়ে নেওয়ার মাধ্যমে বিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রাথমিক প্রক্রিয়া শুরু হবে। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরার প্রতিবেদন অনুযায়ী, জাপানের জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এই কেন্দ্রটি পুনরায় চালু করা সরকারের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ ও মাইলফলক হিসেবে দেখা হচ্ছে।
জনরোষ ও নিরাপত্তার প্রশ্ন
বিদ্যুৎকেন্দ্রটি চালুর খবর ছড়িয়ে পড়তেই নিগাতা প্রদেশে প্রতিবাদের ঝড় উঠেছে। হাড়কাঁপানো শীত উপেক্ষা করে কয়েক ডজন বিক্ষোভকারী কেন্দ্রের প্রবেশপথে অবস্থান নিয়েছেন। স্থানীয়দের অভিযোগ, বড় ধরনের ভূমিকম্পের ঝুঁকি থাকা সত্ত্বেও জননিরাপত্তাকে তুচ্ছ করে সরকার এই বিপজ্জনক পথে হাঁটছে।
বিক্ষোভে অংশ নেওয়া ৭৩ বছর বয়সী এক স্থানীয় বাসিন্দা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “কাশিওয়াজাকি থেকে উৎপাদিত বিদ্যুৎ যাবে টোকিওতে, অথচ জীবনের ঝুঁকি নেব আমরা—এটা কেমন বিচার?” সম্প্রতি এক জনমত জরিপে দেখা গেছে, প্রায় ৬০ শতাংশ স্থানীয় বাসিন্দা এই কেন্দ্রটি পুনরায় চালুর বিপক্ষে মত দিয়েছেন। ইতোমধ্যে ৪২ হাজারেরও বেশি মানুষের স্বাক্ষর সংবলিত একটি পিটিশন সরকারের কাছে জমা দেওয়া হয়েছে, যেখানে এলাকাটিকে ভূমিকম্প-সংবেদনশীল (Earthquake-sensitive) হিসেবে চিহ্নিত করে কেন্দ্রটি বন্ধ রাখার দাবি জানানো হয়েছে।
নিরাপত্তা ব্যবস্থায় আধুনিকায়ন
ফুকুশিমা বিপর্যয় থেকে শিক্ষা নিয়ে কাশিওয়াজাকি-কারিওয়া কমপ্লেক্সে ব্যাপক নিরাপত্তা সংস্কার করা হয়েছে। এখানে বর্তমানে ১৫ মিটার উঁচু সুনামি প্রতিরোধ দেয়াল (Tsunami Wall) নির্মাণ করা হয়েছে। এছাড়া জরুরি ব্যাকআপ বিদ্যুৎ ব্যবস্থা এবং অত্যাধুনিক অগ্নিনির্বাপক প্রযুক্তি যুক্ত করা হয়েছে। উল্লেখ্য, ২০১১ সালের আগে জাপানের মোট চাহিদার এক-তৃতীয়াংশ বিদ্যুৎ আসত পারমাণবিক শক্তি থেকে। দুর্ঘটনার পর সব কেন্দ্র বন্ধ করে দেওয়া হলেও কঠোর নিরাপত্তা মানদণ্ড (Safety Protocols) মেনে এ পর্যন্ত পশ্চিম ও দক্ষিণ জাপানে ১৪টি রিঅ্যাক্টর পুনরায় চালু করা হয়েছে।
ভবিষ্যৎ লক্ষ্য: কার্বন নিরপেক্ষ জাপান
জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচি এবং তাঁর প্রশাসন পারমাণবিক শক্তির এই পুনরুজ্জীবনের পক্ষে জোরালো সওয়াল করছেন। সরকারের লক্ষ্য হলো ২০৫০ সালের মধ্যে জাপানকে একটি কার্বন নিরপেক্ষ (Carbon Neutral) রাষ্ট্রে পরিণত করা। জীবাশ্ম জ্বালানি বা Fossil Fuel-এর ওপর নির্ভরশীলতা কমিয়ে গ্রিন এনার্জি ও পারমাণবিক শক্তির ভারসাম্য রক্ষার মাধ্যমেই জলবায়ু পরিবর্তনের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে চাইছে টোকিও।
তবে প্রযুক্তিগত উৎকর্ষ আর সাধারণ মানুষের জীবনশঙ্কার এই দ্বন্দ্বে কাশিওয়াজাকি-কারিওয়া কেন্দ্রটির ভবিষ্যৎ কোন দিকে মোড় নেয়, এখন সেটিই দেখার বিষয়।