• দেশজুড়ে
  • তিন সভ্যতার নীরব সাক্ষী যশোরের ‘দমদম পীরস্থান ঢিবি’

তিন সভ্যতার নীরব সাক্ষী যশোরের ‘দমদম পীরস্থান ঢিবি’

যশোরের মণিরামপুরে ১৮শ বছরের প্রাচীন প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনের সন্ধান; বৌদ্ধ, জৈন ও মুসলিম ঐতিহ্যের অনন্য এক মেলবন্ধন এই পীরস্থান ঢিবি।

দেশজুড়ে ১ মিনিট পড়া
তিন সভ্যতার নীরব সাক্ষী যশোরের ‘দমদম পীরস্থান ঢিবি’

প্রাচীন বাংলার জনপদ যশোরের মণিরামপুরে মাটির নিচে লুকিয়ে আছে হাজার বছরের বিস্ময়। মণিরামপুর বাজার থেকে মাত্র ৬ কিলোমিটার দূরে ভোজগাতি ইউনিয়নের দোনার গ্রামে নিভৃতে দাঁড়িয়ে আছে ‘দমদম পীরস্থান’ ঢিবি। প্রত্নতাত্ত্বিক খননের ফলে বেরিয়ে এসেছে ১৮শ বছরেরও বেশি প্রাচীন এক জনপদের ধ্বংসাবশেষ, যা যিশুখ্রিষ্টের জন্মের সমসাময়িক এক সুপ্রাচীন ইতিহাসের কথা বলে। এক সময়ের সুলতানি আমলের স্থাপনা বলে পরিচিত এই স্থানটি এখন বিশ্ব ইতিহাসের এক অনন্য দলিল।

যশোরের মণিরামপুর উপজেলার দোনার গ্রামে অবস্থিত দমদম পীরস্থান ঢিবি কেবল একটি মাটির স্তূপ নয়, বরং এটি তিন ভিন্ন ধর্ম ও সভ্যতার এক মেলবন্ধন। ১৯৮৬ সালে স্থানীয়রা মাটি খুঁড়তে গিয়ে প্রথম এই প্রাচীন ইটের গাঁথুনির সন্ধান পান। পরবর্তীতে ২০০৪-০৫ অর্থবছর থেকে প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর এখানে নিয়মতান্ত্রিক খনন কাজ শুরু করে।

আবিষ্কৃত স্থাপত্য ও ইতিহাস খননকালে এই স্থানে একটি বিশাল মন্দিরের ধ্বংসাবশেষ উন্মোচিত হয়েছে। প্রথম দফার খননে ১৮টি কক্ষ এবং পরবর্তীতে গর্ভগৃহের ভেতরে আরও ২৪টি ছোট-বড় কক্ষ পাওয়া যায়। প্রত্নতত্ত্ববিদদের মতে, এই স্থাপত্যটি মূলত দুটি পৃথক যুগে নির্মিত হয়েছিল। শুরুতে এটি বর্গাকার থাকলেও পরে পবিত্রতা ও আয়তন বৃদ্ধির জন্য এটিকে আয়তাকার রূপ দেওয়া হয়। এখানকার উন্নত স্থাপত্যশৈলী আজও পর্যটক ও গবেষকদের বিস্মিত করে।

বৌদ্ধ, জৈন ও মুসলিম ঐতিহ্যের সহাবস্থান এই প্রত্নস্থলটি অনন্য কারণ এখানে বৌদ্ধ, জৈন ও মুসলিম সভ্যতার নিদর্শনের এক অভূতপূর্ব সমাবেশ ঘটেছে। খননে প্রাপ্ত ছোট পাথরের বুদ্ধমূর্তি ও পোড়ামাটির ফলক এখানে বৌদ্ধ উপাসনালয় থাকার প্রমাণ দেয়। অন্যদিকে, পদ্মপাপড়ি খচিত ইট এবং জৈন তীর্থঙ্কর মল্লিনাথের বিগ্রহের উপস্থিতি নির্দেশ করে যে এটি এক সময় জৈন মন্দির ছিল। কালক্রমে এলাকাটি জনশূন্য হয়ে পড়লে কোনো এক সুফি সাধক এখানে আস্তানা গাড়েন, যার ফলে এটি স্থানীয়ভাবে ‘পীরস্থান’ হিসেবে পরিচিতি পায়।

নামকরণের রোমাঞ্চকর লোককথা স্থানীয় প্রবীণদের মতে, অতীতে এই ঢিবির ওপর দিয়ে হাঁটার সময় মাটির নিচ থেকে ‘গুম গুম’ বা ‘দমদম’ শব্দ শোনা যেত। সেই রহস্যময় শব্দ থেকেই এর নাম হয় ‘দমদম ঢিবি’। এছাড়া সংলগ্ন এলাকায় ‘মঙ্গল শাহ’ নামে এক পীরের আস্তানা এবং রহস্যঘেরা ‘কুমারী দিঘি’ নিয়ে এলাকায় নানা লোককথা প্রচলিত আছে।

রহস্যময় ‘অচিন বৃক্ষ’ এই প্রত্নস্থলের অন্যতম বড় আকর্ষণ হলো এখানকার রহস্যময় ‘অচিন বৃক্ষ’। কথিত আছে, ১৮শ বছর আগে মন্দির প্রতিষ্ঠার সময় এই গাছগুলো রোপণ করা হয়েছিল। বর্তমানে টিকে থাকা তিনটি গাছের এক অদ্ভুত বৈশিষ্ট্য রয়েছে; বছরের ছয় মাস এগুলো শুকনো কাঠের মতো প্রাণহীন থাকে এবং বাকি ছয় মাস নতুন পাতা ও সুগন্ধি ফুলে ভরে ওঠে। উদ্ভিদবিজ্ঞানীদের কাছে এটি আজও এক অমীমাংসিত রহস্য।

ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা বর্তমানে এই প্রত্নস্থলটি পর্যটকদের কাছে আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠেছে। গবেষকদের মতে, খ্রিস্টীয় দ্বিতীয় বা তৃতীয় শতকের ‘কাজল শলাকা’ এবং ‘রুলেটেড’ মৃৎপাত্রের মতো আবিষ্কার এই স্থানকে বাংলাদেশের অন্যতম প্রাচীন মন্দিরের মর্যাদা দিয়েছে। সরকারিভাবে একে পূর্ণাঙ্গ পর্যটন কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলা হলে এটি দেশের অন্যতম সেরা হেরিটেজ সাইট হয়ে উঠতে পারে।

Tags: monirampur jessore news bangladesh history archaeological-site damdam-pirasthan ancient-civilization