অস্ট্রেলিয়ার পার্থ স্টেডিয়ামের প্রেস কনফারেন্স কক্ষ। ফ্লাডলাইটের নিচে সবুজ গালিচায় যে লড়াইয়ের অপেক্ষা, তার আগে সংবাদমাধ্যমের মুখোমুখি বাংলাদেশ নারী ফুটবল দলের অধিনায়ক আফিদা খন্দকার। পাশে কোচ পিটার বাটলার। প্রতিপক্ষের আক্রমণ সামলানোর মতোই সাংবাদিকদের ধারালো প্রশ্নগুলো সুকৌশলে সামলালেন আফিদা। কণ্ঠে নেই কোনো বাড়তি চাপ, বরং একরাশ আত্মবিশ্বাস নিয়ে জানালেন—উজবেকিস্তানের বিপক্ষে গ্রুপ পর্বের শেষ ম্যাচে তাদের হারানোর কিছু নেই, আছে কেবল পাওয়ার বিশাল এক দিগন্ত।
ইতিহাসের দোরগোড়ায় লাল-সবুজের প্রতিনিধিরা বাংলাদেশের ফুটবল ইতিহাসে এই মুহূর্তটি এক অনন্য মাইলফলক। ১৯৮০ সালে পুরুষ দল একবার এশিয়া কাপের চূড়ান্ত পর্বে খেললেও গত ৪৬ বছরে আর সেই উচ্চতায় পৌঁছানো সম্ভব হয়নি। সেখানে ২০২৬ সালের ‘AFC Women's Asian Cup’-এ প্রথমবারের মতো এশিয়ার শীর্ষ মঞ্চে জায়গা করে নিয়েছে সাবিনা-আফিদারা। সোমবার উজবেকিস্তানের বিপক্ষে ম্যাচটি কেবল একটি ৯০ মিনিটের খেলা নয়; এটি বাংলাদেশের ফুটবলের নতুন এক ইতিহাস রচনার সুযোগ। এই ম্যাচে ‘Full Points’ বা জয় পেলে নিশ্চিত হতে পারে কোয়ার্টার ফাইনালের টিকিট, যা ভবিষ্যতে অলিম্পিক ও ফিফা ওয়ার্ল্ড কাপের স্বপ্নকেও বাস্তবে রূপ দিতে পারে।
হারানোর ভয়হীন এক নির্ভীক অধিনায়ক র্যাঙ্কিংয়ে উজবেকিস্তান এগিয়ে থাকলেও আফিদার কণ্ঠে ‘Underdog’ হিসেবে লড়ার মানসিকতা স্পষ্ট। জয়ের বিকল্প নেই—এমন সমীকরণের সামনে দাঁড়িয়ে অধিনায়ক অত্যন্ত সাবলীলভাবে বলেন, “কাল আমাদের গ্রুপের শেষ ম্যাচ। আমরা সবাই চেষ্টা করব সেরাটা দেওয়ার। আমাদের এখানে হারানোর কিছু নেই। আমরা প্রথমবারের মতো কোয়ালিফাই করেছি এবং এশিয়ান মঞ্চে দেশকে রিপ্রেজেন্ট করছি—এটাই আমাদের কাছে অনেক বড় গর্বের বিষয়।” ড্র করলে হয়তো বিদায় নিতে হবে, কিন্তু জয় পেলে খুলে যাবে ফুটবলের এক নতুন অধ্যায়।
মুস্তাফিজের ছায়া নাকি নিজস্ব স্বকীয়তা? সংবাদ সম্মেলনে আফিদার উত্তরগুলো ছিল অত্যন্ত সংক্ষিপ্ত ও পরিমিত। বাংলাদেশ ক্রিকেটের তারকা বোলার মুস্তাফিজুর রহমানও সাংবাদিকদের সামনে এমন স্বল্পভাষী হিসেবে পরিচিত। আফিদা কি তবে ‘কাটার মাস্টার’কে অনুসরণ করছেন? এমন কৌতূহলী প্রশ্নের উত্তরে হাসিমুখেই অধিনায়ক বলেন, “মুস্তাফিজ ভাই উনার জায়গায় সেরা। আমি ওভাবে কাউকে ফলো করি না। আসলে আমি কাজ করে দেখাতেই বেশি পছন্দ করি। কথা বলতে গেলে অনেক কিছুই বলা যায়, কিন্তু মাঠে কাজ করে দেখানোই আসল। কাজ করে দেখালে আর কথা না বললেও চলে।”
পার্থের লড়াই ও বড় স্বপ্নের হাতছানি পার্থের কন্ডিশনে মানিয়ে নিয়ে বাংলাদেশের মেয়েরা এখন মুখিয়ে আছে তাদের ‘Game Plan’ বাস্তবায়নের জন্য। কোচ পিটার বাটলারের অধীনে দলের রক্ষণভাগ থেকে আক্রমণভাগ—সবাই জানে এই ম্যাচের গুরুত্ব। উজবেকিস্তান শারীরিকভাবে শক্তিশালী দল হলেও বাংলাদেশের কৌশল হবে দ্রুতগতির ফুটবল এবং নির্ভুল ‘Counter Attack’।
আন্তর্জাতিক এই টুর্নামেন্টে বাংলাদেশের অংশগ্রহণই যেখানে বড় প্রাপ্তি, সেখানে কোয়ার্টার ফাইনালে ওঠার সম্ভাবনা পুরো দেশের ক্রীড়াঙ্গনে নতুন প্রাণের সঞ্চার করেছে। ফুটবল প্রেমীরা এখন অপেক্ষায়—পার্থের মাঠে আফিদারা কেবল ফুটবলই খেলবেন না, লিখবেন এক নতুন মহাকাব্য।