বাংলাদেশের সংসদীয় গণতন্ত্রে সংরক্ষিত ৫০টি নারী আসন কি আসলেও নারীর ক্ষমতায়নের কার্যকর হাতিয়ার, নাকি এটি পুরুষতান্ত্রিক রাজনীতির একটি ‘প্যাট্রন-ক্লাইন্ট’ (Patron-Client) সম্পর্কের বহিঃপ্রকাশ? জাতীয় প্রেসক্লাবে আয়োজিত এক আলোচনা সভায় এই মৌলিক প্রশ্নটিই তুলে ধরেছেন বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিবি) প্রেসিডিয়াম সদস্য জলি তালুকদার। তাঁর মতে, এ দেশে নারী নিপীড়ন ও ধর্ষণের ঘটনার মূলে রয়েছে রাজনীতির বিদ্যমান চরিত্র এবং নারীদের রাজনৈতিক ভাগ্য নির্ধারণে পুরুষতান্ত্রিক মানসিকতার একচ্ছত্র আধিপত্য।
সংরক্ষিত আসন ও পুরুষতান্ত্রিক নিয়ন্ত্রণ শনিবার (৭ মার্চ) আন্তর্জাতিক নারী দিবসকে সামনে রেখে সিপিবি আয়োজিত ‘নারী নিপিড়ন বিরোধী’ এক সভায় জলি তালুকদার অত্যন্ত কড়া ভাষায় বর্তমান সংসদীয় ব্যবস্থার সমালোচনা করেন। তিনি বলেন, “জাতীয় সংসদে সংরক্ষিত ৫০টি নারী আসনে কাদের ‘Nomination’ দেওয়া হবে, তা অত্যন্ত ভয়ংকরভাবে নির্ধারণ করেন পুরুষতান্ত্রিক মানসিকতাসম্পন্ন পুরুষ নেতারা। এটি কোনো স্বতঃস্ফূর্ত গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া নয়।”
তিনি আরও যোগ করেন যে, নারীদের এখনো স্বতন্ত্র রাজনৈতিক সত্তার বদলে পুরুষতান্ত্রিক দৃষ্টিভঙ্গির ফ্রেম থেকেই দেখা হয়। টাকা দিয়ে ভোট কেনা, পেশিশক্তির আস্ফালন (Muscle Power) এবং প্রশাসনিক কারসাজির এই ‘অপরাজনীতি’র জালে পড়ে সাধারণ নারীরা নীতি-নির্ধারণী পর্যায়ে পৌঁছাতে পারছেন না।
রাজনীতির চরিত্র ও নারী নিরাপত্তা জলি তালুকদারের ভাষ্যমতে, বাংলাদেশে ক্রমবর্ধমান ধর্ষণ ও নিপিড়নের ঘটনাবলি কেবল বিচ্ছিন্ন কোনো অপরাধ নয়, বরং এটি রাষ্ট্রের ‘Political Character’ বা রাজনৈতিক চরিত্রের প্রতিফলন। তিনি বলেন, “একটি রাষ্ট্র বা দেশের রাজনীতির গতিপ্রকৃতি যেমন হবে, সেই সমাজের নারীদের নিরাপত্তা ও সামাজিক মর্যাদাও ঠিক তেমনই হবে।” বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট নিয়ে সমালোচনা করে তিনি শাসক দল ও বিরোধী দল—উভয় পক্ষকেই কাঠগড়ায় দাঁড় করান। বিশেষ করে মুক্তিযুদ্ধের চেতনাবিরোধী শক্তির রাজনৈতিক উত্থানকে তিনি নারী অধিকারের জন্য চরম হুমকি হিসেবে অভিহিত করেন।
প্রতিহিংসার রাজনীতি ও মানবাধিকারের সংকট আলোচনা সভায় বিশিষ্ট মানবাধিকার কর্মী ও সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী সারা হোসেন তাঁর বক্তব্যে ক্ষমতার পটপরিবর্তন ও রাজনৈতিক সংস্কৃতির পরিবর্তনের ওপর গুরুত্বারোপ করেন। তিনি বলেন, “দেশ অর্থনৈতিকভাবে অগ্রসর হলেও প্রতিহিংসা ও হয়রানির রাজনীতি (Politics of Vengeance) থেকে আমরা বের হতে পারছি না। আমাদের সব ধরনের অন্যায়ের বিরুদ্ধে সোচ্চার হতে হবে। এমনকি আমাদের রাজনৈতিক মতাদর্শের ভিন্নতা থাকলেও, কারো প্রতি অন্যায় হলে তার পাশে দাঁড়ানোই হলো প্রকৃত গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ।”
অংশগ্রহণ ও সংহতি সিপিবির এই আলোচনা সভায় সমাজের বিভিন্ন স্তরের প্রতিনিধিরা অংশ নেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাচ্যকলা বিভাগের শিক্ষক দীপ্তি দত্ত, বিশিষ্ট চিকিৎসক আখতার বানু, সিপিবি ও কৃষক সমিতির কেন্দ্রীয় সদস্য লাকী আক্তারসহ আরও অনেকে তাঁদের বক্তব্যে নারীর সম-অধিকার ও মানবিক মর্যাদা প্রতিষ্ঠার দাবি জানান। বক্তারা একমত হন যে, রাজনীতির আমূল সংস্কার এবং পুরুষতান্ত্রিক মানসিকতার বিবর্তন ছাড়া নারীর ‘True Empowerment’ বা প্রকৃত ক্ষমতায়ন অধরাই থেকে যাবে।
সভা শেষে একটি সুন্দর ও নিরাপদ সমাজের প্রত্যাশায় সংহতি প্রকাশ করেন সিপিবির ঢাকা দক্ষিণের নারী শাখার সম্পাদক মমতা চক্রবর্তী এবং বস্তিবাসী ইউনিয়নের প্রেসিডেন্ট কুলসুম বেগমসহ অন্যান্য নেতৃবৃন্দ।