মধ্যপ্রাচ্যের আকাশ যখন যুদ্ধের ঘনঘটায় আচ্ছন্ন, ঠিক তখনই এক ভিন্ন আবহে পবিত্র ঈদুল ফিতর উদযাপন করল ইরান। দীর্ঘ ৩০ দিনের সিয়াম সাধনা শেষে শনিবার (২১ মার্চ) দেশজুড়ে পালিত হচ্ছে ঈদ। তবে এবারের ঈদ ইরানিদের কাছে কেবল ধর্মীয় উৎসব নয়, বরং জাতীয় সংহতি ও প্রতিরোধের এক নতুন বার্তা হিসেবে দেখা দিয়েছে। ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চলমান সংঘাতের উত্তেজনার মধ্যেই তেহরানসহ দেশটির প্রধান শহরগুলোতে উন্মুক্ত ময়দানে সমবেত হয়ে ঈদের নামাজ আদায় করেছেন লাখো মানুষ।
তেহরানের রাজপথে জনসমুদ্র
ইরানের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে প্রচারিত সরাসরি ফুটেজে দেখা গেছে, ভোরের আলো ফুটতেই রাজধানী তেহরানের ‘ইমাম খোমেনি গ্র্যান্ড মস্ক’ অভিমুখে মানুষের ঢল নামে। মসজিদের বিশাল চত্বর ছাড়িয়ে ভিড় ছড়িয়ে পড়ে আশপাশের প্রধান সড়কগুলোতে। জায়গার সংকুলান না হওয়ায় হাজার হাজার মুসল্লিকে উন্মুক্ত রাজপথেই জায়নামাজ বিছিয়ে নামাজে শরিক হতে দেখা যায়।
কেবল তেহরানই নয়, দেশের পশ্চিমাঞ্চলীয় শহর আরাক, দক্ষিণ-পূর্বের জাহেদান এবং সীমান্ত শহর আবাদানেও বড় বড় উন্মুক্ত ময়দানে ঈদের জামাত অনুষ্ঠিত হয়েছে। এসব জামাতে সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণে ছিল অকুতোভয় এক মানসিকতার প্রতিফলন, যা এই অঞ্চলের বর্তমান Geopolitics বা ভূ-রাজনীতিতে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ।
উৎসবের মাঝে বিষাদের সুর: উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের জানাজা
এবারের ঈদের দিনটি ইরানের জন্য একই সঙ্গে উৎসব ও গভীর শোকের। একদিকে ঈদের আনন্দ, অন্যদিকে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের সাম্প্রতিক বিমান হামলায় নিহত দেশটির গোয়েন্দা মন্ত্রী (Intelligence Minister) এবং বিপ্লবী গার্ড বা IRGC-র মুখপাত্রের জানাজা—এই দুইয়ে মিলে এক গুমোট পরিবেশের সৃষ্টি হয়েছে।
ঈদের নামাজের পরপরই নিহতের কফিন নিয়ে শোকযাত্রা বের করা হয়। সাধারণ ইরানিরা তাদের প্রিয় নেতাদের শেষ বিদায়ে অশ্রুসজল চোখে জানাজায় অংশগ্রহণ করেন। এই জানাজা যেন একটি রাজনৈতিক সমাবেশে রূপ নেয়, যেখানে জনগণের কণ্ঠে ‘প্রতিরোধ’ ও ‘প্রতিশোধের’ স্লোগান শোনা যায়। বিশ্লেষকদের মতে, যুদ্ধের ময়দানে থাকা একটি জাতির জন্য এই আধ্যাত্মিক শক্তি ও সংহতি অত্যন্ত জরুরি।
আঞ্চলিক উত্তেজনা ও ইরানিদের মানসিকতা
বর্তমান Regional Conflict বা আঞ্চলিক সংঘাতের কেন্দ্রবিন্দুতে থাকা ইরান গত কয়েক সপ্তাহ ধরে একের পর এক প্রতিকূলতার সম্মুখীন হচ্ছে। তবে এই প্রতিকূলতা যে তাদের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা বা ধর্মীয় আচারকে স্তব্ধ করতে পারেনি, তারই প্রমাণ আজকের এই স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ।
নামাজ শেষে খুতবায় ধর্মীয় নেতারা মুসলিম উম্মাহর ঐক্য এবং বহিঃশত্রুর মোকাবিলায় ধৈর্য ও সাহসিকতার ওপর গুরুত্বারোপ করেন। মধ্যপ্রাচ্যের টালমাটাল এই পরিস্থিতিতে ইরানিদের এই ‘ওপেন এয়ার’ বা উন্মুক্ত ময়দানে নামাজ আদায়ের বিষয়টি বৈশ্বিক সংবাদমাধ্যমগুলোতে বিশেষ গুরুত্বের সাথে প্রচারিত হচ্ছে। অনেকেই মনে করছেন, এটি সরাসরি ইসরায়েল ও পশ্চিমা বিশ্বের প্রতি তেহরানের একটি শক্ত বার্তা—যে কোনো পরিস্থিতিতেই তারা মানসিকভাবে ভেঙে পড়েনি।
উপসংহার
ইরানের এবারের ঈদ উৎসব যেন আধ্যাত্মিকতা এবং দেশপ্রেমের এক অভূতপূর্ব সংমিশ্রণ। যুদ্ধের রণহুঙ্কার আর মিসাইল হামলার আশঙ্কার মাঝেও ইরানিরা যেভাবে রাজপথে নেমে ঈদের প্রার্থনা করেছেন, তা তাদের সামাজিক ও ধর্মীয় দৃঢ়তারই বহিঃপ্রকাশ। উৎসবের আনন্দ ছাপিয়ে আজ তেহরানের আকাশে বাতাসে কেবলই ভেসে বেড়াচ্ছে শোক আর সাহসিকতার এক অনন্য গাথা।