মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনৈতিক সমীকরণ এক অভাবনীয় ও বিপজ্জনক মোড় নিতে যাচ্ছে। ইরানের অভ্যন্তরে সম্ভাব্য সরাসরি ‘Ground Invasion’ বা স্থল হামলার লক্ষ্যে অত্যন্ত শক্তিশালী রণকৌশল ও ব্যাপক প্রস্তুতি শুরু করেছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় তথা পেন্টাগন (Pentagon) ইতিমধ্যে এই অভিযানের একটি নিশ্ছিদ্র ও বিস্তারিত পরিকল্পনা চূড়ান্ত করেছে। মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিবিএস নিউজ (CBS News) শনিবার (২১ মার্চ) সংশ্লিষ্ট নির্ভরযোগ্য সূত্রের বরাতে এই চাঞ্চল্যকর তথ্য সামনে এনেছে।
রণকৌশল সাজাচ্ছে পেন্টাগন: কী আছে সেই পরিকল্পনায়?
সূত্রমতে, পেন্টাগনের জ্যেষ্ঠ সামরিক কর্মকর্তারা একটি পূর্ণাঙ্গ স্থল অভিযানের রূপরেখা তৈরির জন্য বিশেষ অনুরোধ জানিয়েছিলেন। সেই আহ্বানে সাড়া দিয়ে মার্কিন প্রতিরক্ষা বিশ্লেষকরা ইরানের ভৌগোলিক ও সামরিক শক্তি বিবেচনায় নিয়ে একটি ‘Military Strategy’ বা সামরিক কৌশলপত্র তৈরি করেছেন।
এই পরিকল্পনাটি এতটাই সূক্ষ্মভাবে করা হয়েছে যে, কেবল আক্রমণ নয় বরং যুদ্ধকালীন পরিস্থিতিতে ইরানের নিয়মিত সেনাবাহিনী এবং ‘Paramilitary’ বা আধাসামরিক বাহিনীর সদস্যদের আটক করা হলে তাদের সাথে কেমন আচরণ করা হবে, কোথায় রাখা হবে এবং কোন প্রক্রিয়ায় তাদের বন্দি শিবিরে স্থানান্তর করা হবে—তারও একটি বিস্তারিত ‘Logistics Plan’ তৈরি রাখা হয়েছে।
ট্রাম্পের দ্বিধা নাকি রণকৌশল?
ইরানে সরাসরি সেনা পাঠানোর বিষয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এখন গভীর চিন্তাভাবনা করছেন। তবে ‘Commander-in-Chief’ হিসেবে তিনি ঠিক কোন পরিস্থিতিতে বা কোন ‘Red Line’ অতিক্রান্ত হলে চূড়ান্ত হামলার নির্দেশ দেবেন, তা এখনো স্পষ্ট নয়।
উল্লেখ্য যে, গত মঙ্গলবার এক সংবাদ সম্মেলনে ট্রাম্প জানিয়েছিলেন তিনি ইরানে কোনো ‘Ground Troops’ পাঠাবেন না। কিন্তু এর পরপরই এক সাংবাদিকের প্রশ্নের জবাবে তার রহস্যময় মন্তব্য ছিল, “যদি আমি সেনা পাঠাইও, তবে সেটা (এখনই) আপনাদের বলব না।” ট্রাম্পের এই দ্বিমুখী অবস্থানকে অনেক বিশেষজ্ঞ ‘Psychological Warfare’ বা মনস্তাত্ত্বিক লড়াই হিসেবে দেখছেন, যা তেহরানকে চাপে রাখার একটি কৌশল হতে পারে।
হোয়াইট হাউসের অবস্থান: পরিকল্পনা মানেই যুদ্ধ নয়
স্থল হামলার এই প্রস্তুতির বিষয়ে হোয়াইট হাউসের সাথে যোগাযোগ করা হলে ট্রাম্পের প্রেস সেক্রেটারি (Press Secretary) ক্যারোলিন লেভেট এক লিখিত বিবৃতিতে বিষয়টি ব্যাখ্যা করেছেন। তিনি জানান, সম্ভাব্য সকল পরিস্থিতির জন্য আগাম প্রস্তুতি রাখা এবং প্রেসিডেন্টের সামনে বিভিন্ন ‘Military Options’ বা বিকল্প খোলা রাখা প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের নিয়মিত কাজেরই অংশ।
লেভেট স্পষ্ট করে বলেন, “সামরিক পরিকল্পনা করার মানে এই নয় যে, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ইরানে স্থল অভিযানের বিষয়ে চূড়ান্ত কোনো সিদ্ধান্ত নিয়ে নিয়েছেন। সর্বাধিনায়ক হিসেবে তার হাতে যেন সর্বোচ্চ প্রস্তুতি থাকে, সেটিই নিশ্চিত করা হচ্ছে।”
মধ্যপ্রাচ্যে মেরিন সেনার ঢল: যুদ্ধের মেঘ ঘনীভূত?
পেন্টাগনের এই কাগজের পরিকল্পনার পাশাপাশি মাঠপর্যায়েও সক্রিয়তা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। গত কয়েক দিন ধরে মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন কৌশলগত ঘাঁটিতে কয়েক হাজার মার্কিন মেরিন (Marines) সেনাকে মোতায়েন করা শুরু করেছে ওয়াশিংটন। ধারণা করা হচ্ছে, আগামী এক সপ্তাহের মধ্যে এই বিশাল সেনাবহর অঞ্চলটিতে তাদের নির্ধারিত অবস্থানে পৌঁছে যাবে।
সামরিক বিশ্লেষকদের মতে, একসঙ্গে এত বিপুল পরিমাণ দক্ষ সেনার মুভমেন্ট কেবল মহড়া বা সতর্কবার্তার মধ্যে সীমাবদ্ধ নাও থাকতে পারে। যদি কূটনৈতিক আলোচনা ব্যর্থ হয়, তবে পেন্টাগনের এই ড্রয়ারে থাকা ‘ইনভেশন প্ল্যান’ যে কোনো মুহূর্তে কার্যকর করার পথে হাঁটতে পারে হোয়াইট হাউস। বর্তমানে পুরো বিশ্বই উদ্বেগের সাথে পর্যবেক্ষণ করছে যে, মধ্যপ্রাচ্যের এই অস্থিরতা কি শেষ পর্যন্ত বড় কোনো সামরিক সংঘাতে রূপ নেবে কি না।