মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতা ও হরমুজ প্রণালি ঘিরে ঘনীভূত উত্তেজনার মধ্যেই বাংলাদেশের জ্বালানি নিরাপত্তায় আশার আলো দেখা যাচ্ছে। যুদ্ধের ঝুঁকি মাড়িয়ে একে একে চট্টগ্রাম বন্দরে পৌঁছাতে শুরু করেছে তরল প্রাকৃতিক গ্যাস (LNG) ও তরল পেট্রোলিয়াম গ্যাস (LPG) বোঝাই বিশালাকার জাহাজ। চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ‘Strategic Route’ হরমুজ প্রণালি অতিক্রম করে ৪টি জাহাজ ইতিমধ্যেই বন্দরে নোঙর করেছে এবং আরও ৪টি জাহাজ বর্তমানে বাংলাদেশে পৌঁছানোর প্রক্রিয়ায় (Pipeline) রয়েছে।
বন্দরে পৌঁছেছে জ্বালানির বড় চালান বন্দর সূত্রে জানা গেছে, জ্বালানি আমদানির ‘Supply Chain’ সচল রাখতে কাতার ও ওমান থেকে আসা জাহাজগুলো অগ্রাধিকার ভিত্তিতে বন্দরে ভেড়ানো হচ্ছে। কাতারের রাস লাফান বন্দর থেকে ৬৩ হাজার ৩৮৩ মেট্রিক টন এলএনজি নিয়ে ‘আল জোরা’ (Al Zora) জাহাজটি গত ৩ মার্চ চট্টগ্রাম বন্দরে পৌঁছায়। এর মাত্র দুদিন পর ৫ মার্চ ৬৩ হাজার ৭৫ মেট্রিক টন এলএনজি নিয়ে বন্দরে ভিড়েছে ‘আল জাসাসিয়া’ (Al Jasasiya)।
জ্বালানি গ্যাসের পাশাপাশি শিল্প উৎপাদনে ব্যবহৃত কাঁচামাল নিয়ে আসা জাহাজও বন্দরে পৌঁছেছে। সংযুক্ত আরব আমিরাতের ফুজাইরাহ বন্দর থেকে ৫ হাজার ১৯ মেট্রিক টন মেরিন ইথানল গ্যাস (MEG) নিয়ে ‘বে-ইয়াসু’ জাহাজটি ৫ মার্চ বন্দরে নোঙর করে। এর আগে ২৬ ফেব্রুয়ারি ওমানের সোহার বন্দর থেকে ১৯ হাজার ৩১৬ মেট্রিক টন এলপিজি নিয়ে আসে ‘জি-ওয়াইএমএন’ নামের আরেকটি জাহাজ।
পাইপলাইনে থাকা জাহাজ ও আগামীর শিডিউল বন্দর কর্তৃপক্ষের ট্রাফিক বিভাগ জানিয়েছে, আজ রোববার (৮ মার্চ) দুপুর ২টায় ওমানের সোহার বন্দর থেকে ২২ হাজার ১৭২ মেট্রিক টন এলপিজি নিয়ে ‘এলপিজি সেভেন’ নামের একটি জাহাজ চট্টগ্রাম বন্দরে ভেড়ার কথা রয়েছে। এছাড়া আগামী কয়েক দিনে আরও তিনটি বড় এলএনজি কার্গো বন্দরে পৌঁছাবে। এর মধ্যে কাতার থেকে ৬২ হাজার ৯৮৭ মেট্রিক টন এলএনজি নিয়ে ‘লুসাইল’ (Lusail) জাহাজটি সোমবার (৯ মার্চ) বন্দরে ভিড়বে। ১১ মার্চ ৫৭ হাজার ৬৬৫ মেট্রিক টন এলএনজি নিয়ে ‘আল গালায়েল’ এবং ১৪ মার্চ ৬২ হাজার মেট্রিক টন এলএনজি নিয়ে ‘লেব্রেথাহ’ জাহাজটি চট্টগ্রাম বন্দরে পৌঁছানোর শিডিউল রয়েছে।
হরমুজ প্রণালির সংকট ও জ্বালানি নিরাপত্তা গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরান, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের মধ্যে শুরু হওয়া পাল্টাপাল্টি হামলার জেরে বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ হরমুজ প্রণালি এখন এক প্রকার রণক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে। বৈশ্বিক জ্বালানি বাণিজ্যের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ এই প্রণালি দিয়েই সম্পন্ন হয়। বাংলাদেশের জ্বালানি আমদানির সিংহভাগই আসে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো থেকে, যার জন্য এই প্রণালি ব্যবহার করা অপরিহার্য।
চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের হারবার মাস্টার সৈয়দ রেফায়েত হামিম বলেন, “উত্তেজনাপূর্ণ পরিস্থিতি সত্ত্বেও এখন পর্যন্ত আমাদের আমদানিকৃত জাহাজগুলো সফলভাবে হরমুজ প্রণালি অতিক্রম করতে পেরেছে। মোট ৮টি জাহাজের মধ্যে ৪টি পৌঁছেছে এবং বাকিগুলো আসার পথে রয়েছে। আমরা সার্বক্ষণিক পরিস্থিতির ওপর নজর রাখছি যেন ‘Energy Security’ বিঘ্নিত না হয়।”
ঝুঁকি ও ভবিষ্যৎ শঙ্কা সামরিক বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, যদি হরমুজ প্রণালিতে দীর্ঘমেয়াদী অবরোধ বা বড় ধরনের নৌ-সংঘাত শুরু হয়, তবে বাংলাদেশের মতো আমদানিনির্ভর দেশগুলোর জন্য জ্বালানি সংকট তীব্রতর হতে পারে। বিশেষ করে বিদ্যুৎ উৎপাদন ও শিল্প কারখানায় গ্যাসের চাহিদা মেটানো বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াবে। বর্তমান পরিস্থিতিতে জাহাজগুলোর সফল আগমন দেশের বাজারে জ্বালানির স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে বড় ভূমিকা রাখবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।