সাতক্ষীরা জেলার দিগন্তজোড়া মাঠ এখন সাদা ফুলের গালিচায় ঢাকা। দূর থেকে দেখলে মনে হতে পারে কুয়াশার চাদর, কিন্তু কাছে গেলেই চোখে পড়ে ঔষধি গুণে সমৃদ্ধ কালোজিরার ক্ষেত। প্রচলিত ফসলের তুলনায় কম খরচ আর অধিক মুনাফার (High Profit) নিশ্চয়তা থাকায় সাতক্ষীরার কৃষকরা এখন ব্যাপকভাবে কালোজিরা চাষে আগ্রহী হয়ে উঠেছেন। কেবল কালোজিরাই নয়, এই ক্ষেতগুলোকে কেন্দ্র করে শুরু হয়েছে মধু উৎপাদনের এক নতুন বিপ্লব।
সাদা ফুলে মৌমাছির গুঞ্জন: সমন্বিত চাষের সাফল্য সাতক্ষীরার কালোজিরা ক্ষেতগুলোতে এখন সারি সারি বসানো হয়েছে মৌমাছির বাক্স। কৃষি বিজ্ঞানের ভাষায় একে বলা হয় সমন্বিত চাষ (Integrated Farming)। মৌমাছিরা যখন ফুল থেকে মধু সংগ্রহ করে, তখন তাদের মাধ্যমে ফসলের পরাগায়ন (Cross-pollination) প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত হয়। এতে কালোজিরার ফলন যেমন ১৫-২০ শতাংশ বৃদ্ধি পায়, তেমনি কৃষকরা পান সম্পূর্ণ খাঁটি ও ভেষজ গুণসম্পন্ন মধু। স্থানীয় মধু চাষিদের মতে, সুন্দরবনের খলিসা মধুর পরেই বর্তমানে বাজারে কালোজিরার মধুর চাহিদা ও বাজার মূল্য (Market Value) সবচেয়ে বেশি।
অর্থনৈতিক সমীকরণ: খরচ কম, লাভ বেশি কৃষি বিভাগের তথ্য ও কৃষকদের অভিজ্ঞতা বিশ্লেষণে দেখা যায়, প্রতি বিঘা জমিতে প্রায় ৫ মণ কালোজিরা উৎপাদিত হচ্ছে। বর্তমান বাজারে প্রতি মণ কালোজিরার দাম প্রায় ১২ হাজার টাকা। সেই হিসেবে এক বিঘা জমি থেকে প্রায় ৬০ হাজার টাকার ফসল ঘরে তুলছেন কৃষক। সার, বীজ ও কীটনাশকের দাম বাড়ার পরেও প্রতি বিঘায় উৎপাদন খরচ (Production Cost) দাঁড়াচ্ছে ১৫ থেকে ২০ হাজার টাকা। মাত্র চার মাসের এই ফসলে সব খরচ বাদে নিট মুনাফা থাকছে ৩০ থেকে ৪০ হাজার টাকা। সরিষা বা অন্যান্য রবিশস্যের তুলনায় এই লাভ প্রায় তিনগুণ বেশি।
কৃষকদের দাবি ও সরকারি সহায়তা সাতক্ষীরার কুশখালী ও বৈকারি এলাকার চাষিরা জানান, কালোজিরা একটি লাভজনক ফসল হলেও উৎপাদন উপকরণ বা ইনপুট কস্ট (Input Cost) দিন দিন বাড়ছে। বিশেষ করে সার ও উন্নত মানের বীজের দাম বৃদ্ধি পাওয়ায় প্রান্তিক কৃষকরা কিছুটা হিমশিম খাচ্ছেন। কৃষকদের দাবি, সরকার যদি সহজ শর্তে বা বিনা সুদে কৃষি ঋণ (Agri-loan) এবং প্রযুক্তিগত প্রশিক্ষণ নিশ্চিত করে, তবে এই অঞ্চলে কালোজিরা চাষে নীরব বিপ্লব ঘটে যাবে।
মৌচাষি হাতেম আলী জানান, আগে মধুর জন্য তাদের শরীয়তপুর বা ফরিদপুরের মতো দূরবর্তী জেলায় যেতে হতো। এখন সাতক্ষীরাতেই কালোজিরা চাষ হওয়ায় ঘরে বসেই তারা উন্নত মানের মধু উৎপাদন করতে পারছেন। এতে পরিবহন খরচ ও ঝুঁকি—দুটোই কমেছে।
কৃষি কর্মকর্তাদের পর্যবেক্ষণ সাতক্ষীরা উপজেলা সহকারী কৃষি কর্মকর্তা নাজমা আক্তারের মতে, কালোজিরা কেবল একটি মসলা নয়, এটি একটি হাই-ভ্যালু ক্রপ (High-value Crop)। রোপা আমন কাটার পর জমি যখন পড়ে থাকে, তখন কালোজিরা চাষ করে কৃষকরা বাড়তি আয় করছেন। এরপর আবার সময়মতো পাট চাষও করা সম্ভব হচ্ছে। অর্থাৎ এটি শস্য বহুমুখীকরণ বা ক্রপ রোটেশনে (Crop Rotation) গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
জেলা কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ সাইফুল ইসলাম জানান, সাতক্ষীরা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী চলতি মৌসুমে প্রায় ১০০ হেক্টর জমিতে কালোজিরার চাষ হয়েছে। মৌমাছি চাষের ফলে পরাগায়ন বৃদ্ধি পাওয়ায় দানা পুষ্ট হচ্ছে এবং ফলনও আশাতীত ভালো হচ্ছে। কৃষকদের আধুনিক কৃষি প্রযুক্তি ও উন্নত বিপণন ব্যবস্থা সম্পর্কে নিয়মিত পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।
সাতক্ষীরার এই সফল মডেল প্রমাণ করছে যে, গতানুগতিক কৃষির বাইরে গিয়ে লাভজনক ও ভেষজ ফসলের দিকে মনোযোগ দিলে কৃষকের ভাগ্যের পরিবর্তন সম্ভব। কালোজিরার এই ‘কালো দানা’ এখন সাতক্ষীরার গ্রামীণ অর্থনীতিতে নতুন আশার আলো হয়ে দেখা দিয়েছে।